প্যারাডক্স
৮
Valar dohaeris
সেই রাত
আমার ঝাপসা চোখ দুটো আস্তে আস্তে বুজে আসছিলো ,তাও দেখতে পেলাম আমাকে যে হতভাগা মারতে আসছিলো , সে ঠিক আমার পাশে পড়ে আছে , বোধহয় মরে গেছে কারণ ডান চোখের ঠিক ভিতর দিয়ে একটা তীর ঢুকে খুলিটাকে ভেদ করে অৰ্ধেকটা বেরিয়ে গেছে। আচমকা কে যেন আমার পশে লাফিয়ে এসে আমার হাতের বাঁধা দড়িটা টেনে এক হ্যাঁচকায় দাঁড় করিয়ে দিলো। আমার শরীর কেমন যেন টলছিলো , আমি ভালো করে কিছু দেখতে পাচ্ছিলাম না সব কিছু চোখে কেমন একটা ঝাপসা ঝাপসা ঠেকছিলো। হটাৎ করে দুটো বেশ শক্তশালী হাত আমার কাঁধটা শক্ত করে ধরেঅজানা ভাষায় কিছু একটা বলতে বলতে জোরে একটা ঝাঁকুনি দিলো , আর তাতেই বোধহয় ঝট করে আমার ঘোরটা কেটে গেল। পরিষ্কার চোখে এবার দেখতে পেলাম একটা সাদাচুলো বুড়ো লোক !!! নাঃ বুড়ো বলাটা বোধহয় ঠিক হবে না কারণ এর চেহারা প্রায় আমার দ্বিগুন হলেও ভালো করে দেখে বুঝতে পারলাম এর চুল আর দাড়ি যতই একেবারে ধপধপে সাদা হোক গলার আওয়াজে মনে হচ্ছে বয়সটা আমারই মতন । কিন্তু হাতে একটা অদ্ভুত ধরণের ধনুক , পিঠের থলে থেকে একগোছা তীর উঁকি মারছে , গায়ে একটা সাদা জাপানি কিমোনোর মতো কিছু একটা পরা আশ্চর্য এর কি সবই সাদা নাকি , আরে একি !!!!!!! ....... এবার দেখলাম পিছনে বরফের মতো সাদা একটা ঘোড়া মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে, এটারই কি পায়ের আওয়াজ এতক্ষন শুনছিলাম ?পরপর এতো সব কিছু দেখে না, আমার চোখে কেমন যেন একটা ধাঁধা লেগে গেল.
এবার সমস্যাটা হলো আমার এসবকিছুই কেমন চেনা চেনা লাগছিলো কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পাচ্ছিলাম না।
লোকটা (নাকি ছেলেটা বলবো ?) এবার আমার কাঁধটা ছেড়ে দিয়ে বাঁ হাতে একটা লম্বা ছোরা দিয়ে অনায়াসে
আমার হাতের দড়িটা কুচ করে কেটে ফেললো, আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই অত্যন্ত অমায়িক ভাবে পিঠের থলিতে হাত বাড়িয়ে একটা তীর বার করে ডান হাতের ধনুকে লাগিয়ে , আমার দিক থেকে চোখ না সরিয়ে ডান দিকে ছুঁড়ে দিলো,একটা আর্তনাদ উড়ে এলো শুধু । আমি ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি একটা প্রহরী সে এইদিয়েই তেড়ে আসছিলো , ধপ করে বালিতে পড়ে গেল , তীরটা তার গলা এফোঁড় ওফোঁড় করে দিয়েছে , আর গোটা বিষয়টাই এতো তাড়াতাড়ি চোখের পলকের মধ্যে ঘটে গেল আমি একেবারে স্ট্যাচু হয়ে গেলাম। এই তীরন্দাজ বাবাজিটি কে? সত্যি বলতে কি এইরকম জিনিস আমি আগেও দেখেছি কিন্তু সেটা টিভিতে Green Aroow কে করতে দেখেছি কিন্তু এই ভাবে চোখের সামনে জলজ্যান্ত !!!! ছেলেটা আবার আমাকে অজানা ভাষায় কিছু একটা বলে মাথা নাড়লো। তারপর নিজের জামার মধ্যে থেকে হার জাতীয় কিছু একটা বার করে আমার গলায় ঝুলিয়ে দিলো। আমি কিছু বলার আগেই টের পেলাম হারটা আমার গলার চামড়া ছোঁয়ামাত্রই নিঃস্বাস বন্ধ হয়ে গেল আর গোটা গায়ে প্রচন্ড তাপের একটা ঝটকা লাগলো , মনে হলে সারা গাটা যেন পুড়ে যাচ্ছে ,মাথার ভেতর যেন একটা খুব জোরে একটাতারাবাজী ফেটে গেল ,চোখ নাক কান দিয়ে যেন আগুনের হলকা বেরোতে লাগলো ,কিন্তু সবই ওই কযেক সেকেন্ডের জন্য , তারপর আবার সব ঠিক হয়ে গেল , আমি খাবি খাবার মতো হ্যা হ্যা করে হাঁপাচ্ছিলাম, কিন্তু বেশ টের পাচ্ছিলাম কিরকম যেন একটা হাল্কা হাল্কা লাগছে , কি যেন একটা আলাদা মনে হচ্ছে
"All men must die"
"All men must serve " এটা আমার মুখ দিয়ে আপনাআপনি বেরিয়ে যেবার পরই আমার খেয়াল হলো , এটা কি হলো !!!!!!!! এতক্ষন আমি তো এর একটা কথাও বুঝতে পারছিলাম না আর এখন একেবারে সোজা ইংরেজি !!!
আর আমার গলায় এটা !!!!!! হাত দিয়ে দেখলাম একটা ক্রিস্টালের মালা মাঝে একটা ছোট্ট গোল নক্সা করা লকেট ঝুলছে যার মাঝখান থেকে একটা ছোট্ট সবুজ পাথর জ্বলজ্বল করছে , এটা আবার কি রে বাবা !!! সাদাচুলো তীরন্দাজ ছোকরা এবার বললো " যাক তাও ভালো , আচ্ছা বলতো আমি কে?"
আমি আবার তাকালাম , সাদা ঘোড়া ,সাদা তীর , সাদা বর্ম , একদম বরফের মতো ...... আরে !!!!! আমার মাথায় ঢং করে একটা ঘন্টা নড়ে উঠলো যেন , আমার মুখ দিয়ে আপনাআপনি বেরিয়ে গেল
"তুমি তুষার-রাজ ব্যারন এর পুত্র , যুবরাজ হিমোবোন , দক্ষিণ তুষারের সেরা তীরন্দাজ,সাদা নেকড়ে "
বলে আমি নিজেই অবাক হয়ে গেলাম , এসব কি বকছি আমি !!! আর সত্যি বলতে কি আমি নিজে ঠিক কথা গুলো বলছিনা আমার ভেতর থেকেই কেউ কথা গুলো যেন বলে দিচ্ছে , আমার জবাব শুনে এবার রাজপুত্র হিমোর মুখের ভেতরের অভিজাত সাদা মুলোর মতো দাঁতগুলো ঝকঝক করে উঠলো
" হুম ,তাও ভালো আচ্ছা এবার বলতো তুমি কে ?"
আমি মাথাটা আবার টনটন করে উঠলো , মনে পড়ছে কিন্তু পড়ছে না স্মৃতিগুলো কোথাও যেন একটা গিট্ পাকিয়ে গেছে, মনে করতে না পারার অসহ্য যন্ত্রনায় আমার মুখটা কুঁচকে গেল।
"তোমাকে এখনো এই পৃথিবীর মায়া জড়িয়ে রেখেছে বন্ধু , দেখতো এটা দেখে যদি কিছু মনে পড়ে , আমি ততক্ষন ওদের একটু দেখে আসছি " এই বলে যুবরাজ হিমো আমার হাতে কিছু একটা গুঁজে দিয়ে জাহাজের দিকে এগিয়ে গেল , সেইদিকে তাকিয়ে আমি বুঝতে পারলাম ওরা টা কারা। জাহাজ থেকে এতক্ষনে সাত আট জন নেমে এসেছে আরোও কয়েকজন একটার পর একটা লাফ দিয়ে নামছে, হিমো ওদেরকে একটার পর একটা তীর মেরে ঘায়েল করতে করতে এগিয়ে গেল। আমি হাতের জিনিসটা ভালো করে দেখলাম গোল করে গোটানো একটা বিশাল চাবুক , সরু লিকলিকে
মাথাটায় একটা বর্শার মতো ছোট ধারালো হুকজাতীয় একটা ফলা লাগানো , চাবুকটার রং সোনালী , আর যে হাতলটা আমি ধরে আছি তাতে একটা অদ্ভুত জীব খোদাই করা যার গোটা গাটা মাছের মতো,ল্যাজটা বিদ্যুতের মতো আঁকাবাঁকা কিন্তু মুখটা সিংহের আর সেই সিংহের চোখে দুটো ছোট্ট ছোট্ট লাল পাথর জ্বলজ্বল করছে। . কিন্তু আজব ব্যাপারটা হচ্ছে ,এই চাবুকটা হাতে নেবার পর থেকেই আমার কেমন যেন নিশ্চিত লাগছে। অনেকদিন বাড়ির বাইরে থাকার পর বাড়ি ফিরে নিজের চেনা বালিশে মাথা দিলে যেমন শান্তি লাগে অনেকটা সেরকম , জিনিসটা আশ্চর্যরকমের হালকা, আমি এটাকেও খুব ভালো করে চিনি কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারছিনা।
"দ্রুমম -দ্রুমম-দ্রুমম " , আচমকা আওয়াজে আমি কেঁপে গেলাম , শব্দের উৎসটা সামনের দিকে তাকাতেই টের পাওয়া গেল, জাহাজ থেকে পরপর কয়েকটা আতসবাজির মতো গোলা এসে হিমোর সামনে আছড়ে পড়েছে। হিমোর তীর ধনুক দুটোই ছিটকে পড়েছে , সভয়ে লক্ষ্য করলাম এই সুযোগে কম করে সাত আট জন ওকে ঘিরে ফেললো ,
আর দুজন আমার দিকে তেড়ে এলো।
আমার মেরুদন্ডটা বরাবর একটা শিরশিরে স্রোত বয়ে গেল কিন্তু এবার সেটা ভয়ে নয় , উত্তেজনায় , চাবুকটা আমার হাতের মধ্যে যেন একবার নড়ে উঠলো। কি কান্ড এটাও জ্যান্ত নাকি !!!! একজন আমার খুব কাছে চলে এসেছে সেই বিশাল চেহারা ,গায়ে বর্ম ,হাতে অমানুষিক একটা তরোয়াল আর মাথায় মোষের সিঙের মতো শিরোনাস্ত্র , আমি চাবুকের হাতলটা শক্ত করে ধরলাম , তারপর যে কি হলো নিজেও ভালো করে বুঝতে পারলাম না , আমি নিজে চাবুকটা ওর দিকে চালালাম নাকি চাবুকটা নিজেই নিজেকে চালনা করলো সেটা বুঝতে পারলাম না , শুধু দেখলাম চাবুকটা গায়ে লাগতেই মালটা একটা আর্তনাদ করে ছিটকে পড়ে গেল,আমি অবাক হয়ে গেলাম ! আমার গায়ে যে খুব জোর আছে এমনটা মোটেই নয় বরং উল্টোটাই বলা চলে , কিন্তু এ ছিটকে পড়ে গেল কি করে !!!!! আমি চাবুকটার দিকে তাকিয়ে
আরো অবাক হয়ে গেলাম , সোনালী রংটা উবে গেছে , গোটা চাবুকটা এখন ফসফরাসের মতো জ্বলজ্বল করছে। আরেকটা প্রহরী বোধহয় আমার চেয়েও বেশি অবাক হয়ে গিয়েছিলো , এবার সে আমার দিকে
"হেরে পিকারা... " বলে একটা চিৎকার করে ঝাঁপ দিলো , আমি চোখ বন্ধ করে প্রানপনে চাবুকটা চালালাম ,
"ফ্ল্যাতত " করে একটা শব্দ হলো আর আমার চোখে মুখে পাঁক-কাদাজলের মতো দুর্গন্ধময় আর সাথে একটা কিছু এসে
ছিটকে পড়লো ,আর একটা প্রচন্ড আর্ত চিৎকার। আমি চোখ খুলে দেখলাম দ্বিতীয়জনের শরীরের ওপরের বর্মটা ছিঁড়ে গেছে , চাবুকটা তার বুক ফালাফালা করে দিয়েছে ,এ আর সেখান থেকেই এই কাদাজলের মতো জিনিসটা ছিটকে এসে আমার চোখে মুখে লেগেছে , রক্তর মতো থকথকে জিনিসটা আমার গায়ে লাগতেই আমার সব স্মৃতির সব জট একঝটকায় খুলে গেল। আমি চিনি এদের , এরা দাগোনোস, মানুষের মতোই দেখতে হিংস্র জলদস্যু জীব , এদের শিরায়
রক্তের জায়গায় অন্ধকার আর পাপ বয়ে বেড়ায় , ধ্বংস আর মৃত্যুর জন্যই এদের জন্ম, এদের কোনো হৃদয় নেই ,
এরা ডালকুত্তার মতো গোটা বিশ্বে একজনেরই পোষ মানে , পঞ্চসাগেরের আতঙ্ক , জলদস্যু রাজ পিকারাস এদের প্রভু , এই পিকারাসই একযুগ আগে আমাদের আযম দ্বীপ তছনছ করে দিয়েছিলো , রাজাকে চিরতুষারের নিদ্রায় শুইয়ে দিয়ে ,আমাদের দ্বীপের সবুজের রাণী মা সোনেতা কে তুলে নিয়ে পালিয়ে গিয়েছিলো , আমার দ্বীপ সেই থেকে চির বরফের রাজ্য।আমার এক এক করে সব মনে পড়তে শুরু করলো আর তার জন্যই বোধহয় আমার শরীরের সমস্ত রক্ত দাউ দাউ করে জ্বলতে লাগলো, গলা দিয়ে জানোয়ারের মতো গরগর শব্দ হতে লাগলো ,
চোখে মুখে লেগে তাহাকে চ্যাটচ্যাটে কালো ঠান্ডা রক্তটা হাত দিয়ে মুছতে মুছতে দেখলাম যুবরাজ হিমো দুহাতে দুটো তরোয়াল নিয়ে অমানুষিক ভাবে লড়ে যাচ্ছে সাতটা দাগোনোসের সাথে , হিমোর অসম্ভব গতি ওকে বাঁচিয়ে রাখলেও
এভাবে ও বেশিক্ষন টিকতে পারবে না। আমি মুখ হা করে নিঃস্বাস নিলাম , আকাশে কখন মেঘ করে এসেছে টের পাইনি , এবার যেন মেঘের গর্জন শুনতে পেলাম। সদ্য রক্তের স্বাদ পাওয়া নেকড়ের মতো হিংস্র একটা প্রতিশোধের নেশা আমাকে পেয়ে বসলো , "হ্যাআহহ হ " করে দাঁতের ফাক দিয়ে শিসের মতন একটা শব্দ করে আমি হিমোর দিকে দৌড়ে গেলাম। সাতজন ওকে চারদিক দিয়ে ঘিরে ফেলছিলো ,আমি দৌড়োতে দৌড়োতে চাবুকটা চালালাম , চাবুকের মাথার হুকটা একজন পিঠের ভিতরে মেরুদণ্ডে গেঁথে গেল ,আরেকটা হ্যাঁচকা টানে সেটা বার করে নিতেই মেরুদন্ড দুটুকরো হয়ে সে নেতিয়ে পড়লো , চাবুকটা ঘুরিয়ে আবার মারলাম , এবার পাশের জনের ডান হাতটা ,গরম ছুরি যে ভাবে মাখন কাটে সেইভাবে মতো কেটে নিলো , এবার বাকিরা অন্যমনস্ক হতেই হিমো কচকচ দুজনকে কচুকাটা করে ফেললো। এবার বাকি তিনজনের মধ্যে একজনের গলা লক্ষ্য করে চাবুক চালালাম , চাবুকটাও আমার পোষা কুকুরের মতো ওই দাগোনোসের গলাটাকে পেঁচিয়ে ধরলো ,এক টানে ব্যাটাকে মাটিতে আছড়ে ফেলে ওর গলার ওপর হাঁটু চেপে চাবুকের ধারালো হাতলটা সজোরে গালে ঢুকিয়ে দিলাম
"হেরে পিকারু " বলে চিৎকার করে উঠলো , চিৎকারের সাথে সাথে আমি হাতলটা আরো গভীরে ঢোকাতে ঢোকাতে নেশাগ্রস্থের মতো বলতে লাগলাম
"কোথায় তোদের রাজা পিকারাস ,বল হারামজাদা ,শিগরির বল, নাহলে তোকে আমি মরতেও দেবোনা , বল জলদি ........"
হিমো বাকি দুটোকে শুইয়ে রেখে আমার দিকে আসছিলো , এমন সময় আকাশ ফাটিয়ে একটা বাজ পড়লো আমাদের সামনে , আমি হিমো দুজনেই ছিটকে পড়লাম , বালির চরে সঙ্গে সঙ্গে যেন একটা ঘূর্ণি ঝড় উঠলো , কাদা জল বালি হওয়ার তোড়ে উড়ে আসতে লাগলো। কিছুক্ষণ পরে সব শান্ত হতে দেখলাম , দাগনাসদের জাহাজটা এর মধ্যেই অনেকটা দূরে সরে গেছে এবং আরো দ্রুত সরে যাচ্ছে , সব থেকে বাজে ব্যাপার জাহাজটা জলে ভেসে যাচ্ছে না জল থেকে কয়েকফুট ওপর দিয়ে
ভেসে চলে যাচ্ছে, আমি উঠে বসলাম , চাবুকটা আমার হাতে তখনো ধরা।
হিমো আমার কাছে এসে বললো
" দুঃখিত বন্ধু , তুমি এখনো তৈরী হওনি , এই পৃথিবীর মায়া ,এই মাত্রার মায়া তোমাকে আবার দুর্বল করে দিয়েছে "
বলেই একটানে আমার গলা থেকে হার থেকে লকেট টা ছিঁড়ে নিলো , আবার আমার পা থেকে মাথা অব্দি একটা আগুনের গোলা লাফিয়ে উঠলো , এবারে আর সহ্য করতে পারলাম না , একেবারে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলাম।
(চলবে )
বি দ্র - আবার আসিয়াছি ফিরে , লেখাটা ভালো লাগলে please
৮
Valar dohaeris
সেই রাত
আমার ঝাপসা চোখ দুটো আস্তে আস্তে বুজে আসছিলো ,তাও দেখতে পেলাম আমাকে যে হতভাগা মারতে আসছিলো , সে ঠিক আমার পাশে পড়ে আছে , বোধহয় মরে গেছে কারণ ডান চোখের ঠিক ভিতর দিয়ে একটা তীর ঢুকে খুলিটাকে ভেদ করে অৰ্ধেকটা বেরিয়ে গেছে। আচমকা কে যেন আমার পশে লাফিয়ে এসে আমার হাতের বাঁধা দড়িটা টেনে এক হ্যাঁচকায় দাঁড় করিয়ে দিলো। আমার শরীর কেমন যেন টলছিলো , আমি ভালো করে কিছু দেখতে পাচ্ছিলাম না সব কিছু চোখে কেমন একটা ঝাপসা ঝাপসা ঠেকছিলো। হটাৎ করে দুটো বেশ শক্তশালী হাত আমার কাঁধটা শক্ত করে ধরেঅজানা ভাষায় কিছু একটা বলতে বলতে জোরে একটা ঝাঁকুনি দিলো , আর তাতেই বোধহয় ঝট করে আমার ঘোরটা কেটে গেল। পরিষ্কার চোখে এবার দেখতে পেলাম একটা সাদাচুলো বুড়ো লোক !!! নাঃ বুড়ো বলাটা বোধহয় ঠিক হবে না কারণ এর চেহারা প্রায় আমার দ্বিগুন হলেও ভালো করে দেখে বুঝতে পারলাম এর চুল আর দাড়ি যতই একেবারে ধপধপে সাদা হোক গলার আওয়াজে মনে হচ্ছে বয়সটা আমারই মতন । কিন্তু হাতে একটা অদ্ভুত ধরণের ধনুক , পিঠের থলে থেকে একগোছা তীর উঁকি মারছে , গায়ে একটা সাদা জাপানি কিমোনোর মতো কিছু একটা পরা আশ্চর্য এর কি সবই সাদা নাকি , আরে একি !!!!!!! ....... এবার দেখলাম পিছনে বরফের মতো সাদা একটা ঘোড়া মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে, এটারই কি পায়ের আওয়াজ এতক্ষন শুনছিলাম ?পরপর এতো সব কিছু দেখে না, আমার চোখে কেমন যেন একটা ধাঁধা লেগে গেল.
এবার সমস্যাটা হলো আমার এসবকিছুই কেমন চেনা চেনা লাগছিলো কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পাচ্ছিলাম না।
লোকটা (নাকি ছেলেটা বলবো ?) এবার আমার কাঁধটা ছেড়ে দিয়ে বাঁ হাতে একটা লম্বা ছোরা দিয়ে অনায়াসে
আমার হাতের দড়িটা কুচ করে কেটে ফেললো, আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই অত্যন্ত অমায়িক ভাবে পিঠের থলিতে হাত বাড়িয়ে একটা তীর বার করে ডান হাতের ধনুকে লাগিয়ে , আমার দিক থেকে চোখ না সরিয়ে ডান দিকে ছুঁড়ে দিলো,একটা আর্তনাদ উড়ে এলো শুধু । আমি ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি একটা প্রহরী সে এইদিয়েই তেড়ে আসছিলো , ধপ করে বালিতে পড়ে গেল , তীরটা তার গলা এফোঁড় ওফোঁড় করে দিয়েছে , আর গোটা বিষয়টাই এতো তাড়াতাড়ি চোখের পলকের মধ্যে ঘটে গেল আমি একেবারে স্ট্যাচু হয়ে গেলাম। এই তীরন্দাজ বাবাজিটি কে? সত্যি বলতে কি এইরকম জিনিস আমি আগেও দেখেছি কিন্তু সেটা টিভিতে Green Aroow কে করতে দেখেছি কিন্তু এই ভাবে চোখের সামনে জলজ্যান্ত !!!! ছেলেটা আবার আমাকে অজানা ভাষায় কিছু একটা বলে মাথা নাড়লো। তারপর নিজের জামার মধ্যে থেকে হার জাতীয় কিছু একটা বার করে আমার গলায় ঝুলিয়ে দিলো। আমি কিছু বলার আগেই টের পেলাম হারটা আমার গলার চামড়া ছোঁয়ামাত্রই নিঃস্বাস বন্ধ হয়ে গেল আর গোটা গায়ে প্রচন্ড তাপের একটা ঝটকা লাগলো , মনে হলে সারা গাটা যেন পুড়ে যাচ্ছে ,মাথার ভেতর যেন একটা খুব জোরে একটাতারাবাজী ফেটে গেল ,চোখ নাক কান দিয়ে যেন আগুনের হলকা বেরোতে লাগলো ,কিন্তু সবই ওই কযেক সেকেন্ডের জন্য , তারপর আবার সব ঠিক হয়ে গেল , আমি খাবি খাবার মতো হ্যা হ্যা করে হাঁপাচ্ছিলাম, কিন্তু বেশ টের পাচ্ছিলাম কিরকম যেন একটা হাল্কা হাল্কা লাগছে , কি যেন একটা আলাদা মনে হচ্ছে
"All men must die"
"All men must serve " এটা আমার মুখ দিয়ে আপনাআপনি বেরিয়ে যেবার পরই আমার খেয়াল হলো , এটা কি হলো !!!!!!!! এতক্ষন আমি তো এর একটা কথাও বুঝতে পারছিলাম না আর এখন একেবারে সোজা ইংরেজি !!!
আর আমার গলায় এটা !!!!!! হাত দিয়ে দেখলাম একটা ক্রিস্টালের মালা মাঝে একটা ছোট্ট গোল নক্সা করা লকেট ঝুলছে যার মাঝখান থেকে একটা ছোট্ট সবুজ পাথর জ্বলজ্বল করছে , এটা আবার কি রে বাবা !!! সাদাচুলো তীরন্দাজ ছোকরা এবার বললো " যাক তাও ভালো , আচ্ছা বলতো আমি কে?"
আমি আবার তাকালাম , সাদা ঘোড়া ,সাদা তীর , সাদা বর্ম , একদম বরফের মতো ...... আরে !!!!! আমার মাথায় ঢং করে একটা ঘন্টা নড়ে উঠলো যেন , আমার মুখ দিয়ে আপনাআপনি বেরিয়ে গেল
"তুমি তুষার-রাজ ব্যারন এর পুত্র , যুবরাজ হিমোবোন , দক্ষিণ তুষারের সেরা তীরন্দাজ,সাদা নেকড়ে "
বলে আমি নিজেই অবাক হয়ে গেলাম , এসব কি বকছি আমি !!! আর সত্যি বলতে কি আমি নিজে ঠিক কথা গুলো বলছিনা আমার ভেতর থেকেই কেউ কথা গুলো যেন বলে দিচ্ছে , আমার জবাব শুনে এবার রাজপুত্র হিমোর মুখের ভেতরের অভিজাত সাদা মুলোর মতো দাঁতগুলো ঝকঝক করে উঠলো
" হুম ,তাও ভালো আচ্ছা এবার বলতো তুমি কে ?"
আমি মাথাটা আবার টনটন করে উঠলো , মনে পড়ছে কিন্তু পড়ছে না স্মৃতিগুলো কোথাও যেন একটা গিট্ পাকিয়ে গেছে, মনে করতে না পারার অসহ্য যন্ত্রনায় আমার মুখটা কুঁচকে গেল।
"তোমাকে এখনো এই পৃথিবীর মায়া জড়িয়ে রেখেছে বন্ধু , দেখতো এটা দেখে যদি কিছু মনে পড়ে , আমি ততক্ষন ওদের একটু দেখে আসছি " এই বলে যুবরাজ হিমো আমার হাতে কিছু একটা গুঁজে দিয়ে জাহাজের দিকে এগিয়ে গেল , সেইদিকে তাকিয়ে আমি বুঝতে পারলাম ওরা টা কারা। জাহাজ থেকে এতক্ষনে সাত আট জন নেমে এসেছে আরোও কয়েকজন একটার পর একটা লাফ দিয়ে নামছে, হিমো ওদেরকে একটার পর একটা তীর মেরে ঘায়েল করতে করতে এগিয়ে গেল। আমি হাতের জিনিসটা ভালো করে দেখলাম গোল করে গোটানো একটা বিশাল চাবুক , সরু লিকলিকে
মাথাটায় একটা বর্শার মতো ছোট ধারালো হুকজাতীয় একটা ফলা লাগানো , চাবুকটার রং সোনালী , আর যে হাতলটা আমি ধরে আছি তাতে একটা অদ্ভুত জীব খোদাই করা যার গোটা গাটা মাছের মতো,ল্যাজটা বিদ্যুতের মতো আঁকাবাঁকা কিন্তু মুখটা সিংহের আর সেই সিংহের চোখে দুটো ছোট্ট ছোট্ট লাল পাথর জ্বলজ্বল করছে। . কিন্তু আজব ব্যাপারটা হচ্ছে ,এই চাবুকটা হাতে নেবার পর থেকেই আমার কেমন যেন নিশ্চিত লাগছে। অনেকদিন বাড়ির বাইরে থাকার পর বাড়ি ফিরে নিজের চেনা বালিশে মাথা দিলে যেমন শান্তি লাগে অনেকটা সেরকম , জিনিসটা আশ্চর্যরকমের হালকা, আমি এটাকেও খুব ভালো করে চিনি কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারছিনা।
"দ্রুমম -দ্রুমম-দ্রুমম " , আচমকা আওয়াজে আমি কেঁপে গেলাম , শব্দের উৎসটা সামনের দিকে তাকাতেই টের পাওয়া গেল, জাহাজ থেকে পরপর কয়েকটা আতসবাজির মতো গোলা এসে হিমোর সামনে আছড়ে পড়েছে। হিমোর তীর ধনুক দুটোই ছিটকে পড়েছে , সভয়ে লক্ষ্য করলাম এই সুযোগে কম করে সাত আট জন ওকে ঘিরে ফেললো ,
আর দুজন আমার দিকে তেড়ে এলো।
আমার মেরুদন্ডটা বরাবর একটা শিরশিরে স্রোত বয়ে গেল কিন্তু এবার সেটা ভয়ে নয় , উত্তেজনায় , চাবুকটা আমার হাতের মধ্যে যেন একবার নড়ে উঠলো। কি কান্ড এটাও জ্যান্ত নাকি !!!! একজন আমার খুব কাছে চলে এসেছে সেই বিশাল চেহারা ,গায়ে বর্ম ,হাতে অমানুষিক একটা তরোয়াল আর মাথায় মোষের সিঙের মতো শিরোনাস্ত্র , আমি চাবুকের হাতলটা শক্ত করে ধরলাম , তারপর যে কি হলো নিজেও ভালো করে বুঝতে পারলাম না , আমি নিজে চাবুকটা ওর দিকে চালালাম নাকি চাবুকটা নিজেই নিজেকে চালনা করলো সেটা বুঝতে পারলাম না , শুধু দেখলাম চাবুকটা গায়ে লাগতেই মালটা একটা আর্তনাদ করে ছিটকে পড়ে গেল,আমি অবাক হয়ে গেলাম ! আমার গায়ে যে খুব জোর আছে এমনটা মোটেই নয় বরং উল্টোটাই বলা চলে , কিন্তু এ ছিটকে পড়ে গেল কি করে !!!!! আমি চাবুকটার দিকে তাকিয়ে
আরো অবাক হয়ে গেলাম , সোনালী রংটা উবে গেছে , গোটা চাবুকটা এখন ফসফরাসের মতো জ্বলজ্বল করছে। আরেকটা প্রহরী বোধহয় আমার চেয়েও বেশি অবাক হয়ে গিয়েছিলো , এবার সে আমার দিকে
"হেরে পিকারা... " বলে একটা চিৎকার করে ঝাঁপ দিলো , আমি চোখ বন্ধ করে প্রানপনে চাবুকটা চালালাম ,
"ফ্ল্যাতত " করে একটা শব্দ হলো আর আমার চোখে মুখে পাঁক-কাদাজলের মতো দুর্গন্ধময় আর সাথে একটা কিছু এসে
ছিটকে পড়লো ,আর একটা প্রচন্ড আর্ত চিৎকার। আমি চোখ খুলে দেখলাম দ্বিতীয়জনের শরীরের ওপরের বর্মটা ছিঁড়ে গেছে , চাবুকটা তার বুক ফালাফালা করে দিয়েছে ,এ আর সেখান থেকেই এই কাদাজলের মতো জিনিসটা ছিটকে এসে আমার চোখে মুখে লেগেছে , রক্তর মতো থকথকে জিনিসটা আমার গায়ে লাগতেই আমার সব স্মৃতির সব জট একঝটকায় খুলে গেল। আমি চিনি এদের , এরা দাগোনোস, মানুষের মতোই দেখতে হিংস্র জলদস্যু জীব , এদের শিরায়
রক্তের জায়গায় অন্ধকার আর পাপ বয়ে বেড়ায় , ধ্বংস আর মৃত্যুর জন্যই এদের জন্ম, এদের কোনো হৃদয় নেই ,
এরা ডালকুত্তার মতো গোটা বিশ্বে একজনেরই পোষ মানে , পঞ্চসাগেরের আতঙ্ক , জলদস্যু রাজ পিকারাস এদের প্রভু , এই পিকারাসই একযুগ আগে আমাদের আযম দ্বীপ তছনছ করে দিয়েছিলো , রাজাকে চিরতুষারের নিদ্রায় শুইয়ে দিয়ে ,আমাদের দ্বীপের সবুজের রাণী মা সোনেতা কে তুলে নিয়ে পালিয়ে গিয়েছিলো , আমার দ্বীপ সেই থেকে চির বরফের রাজ্য।আমার এক এক করে সব মনে পড়তে শুরু করলো আর তার জন্যই বোধহয় আমার শরীরের সমস্ত রক্ত দাউ দাউ করে জ্বলতে লাগলো, গলা দিয়ে জানোয়ারের মতো গরগর শব্দ হতে লাগলো ,
চোখে মুখে লেগে তাহাকে চ্যাটচ্যাটে কালো ঠান্ডা রক্তটা হাত দিয়ে মুছতে মুছতে দেখলাম যুবরাজ হিমো দুহাতে দুটো তরোয়াল নিয়ে অমানুষিক ভাবে লড়ে যাচ্ছে সাতটা দাগোনোসের সাথে , হিমোর অসম্ভব গতি ওকে বাঁচিয়ে রাখলেও
এভাবে ও বেশিক্ষন টিকতে পারবে না। আমি মুখ হা করে নিঃস্বাস নিলাম , আকাশে কখন মেঘ করে এসেছে টের পাইনি , এবার যেন মেঘের গর্জন শুনতে পেলাম। সদ্য রক্তের স্বাদ পাওয়া নেকড়ের মতো হিংস্র একটা প্রতিশোধের নেশা আমাকে পেয়ে বসলো , "হ্যাআহহ হ " করে দাঁতের ফাক দিয়ে শিসের মতন একটা শব্দ করে আমি হিমোর দিকে দৌড়ে গেলাম। সাতজন ওকে চারদিক দিয়ে ঘিরে ফেলছিলো ,আমি দৌড়োতে দৌড়োতে চাবুকটা চালালাম , চাবুকের মাথার হুকটা একজন পিঠের ভিতরে মেরুদণ্ডে গেঁথে গেল ,আরেকটা হ্যাঁচকা টানে সেটা বার করে নিতেই মেরুদন্ড দুটুকরো হয়ে সে নেতিয়ে পড়লো , চাবুকটা ঘুরিয়ে আবার মারলাম , এবার পাশের জনের ডান হাতটা ,গরম ছুরি যে ভাবে মাখন কাটে সেইভাবে মতো কেটে নিলো , এবার বাকিরা অন্যমনস্ক হতেই হিমো কচকচ দুজনকে কচুকাটা করে ফেললো। এবার বাকি তিনজনের মধ্যে একজনের গলা লক্ষ্য করে চাবুক চালালাম , চাবুকটাও আমার পোষা কুকুরের মতো ওই দাগোনোসের গলাটাকে পেঁচিয়ে ধরলো ,এক টানে ব্যাটাকে মাটিতে আছড়ে ফেলে ওর গলার ওপর হাঁটু চেপে চাবুকের ধারালো হাতলটা সজোরে গালে ঢুকিয়ে দিলাম
"হেরে পিকারু " বলে চিৎকার করে উঠলো , চিৎকারের সাথে সাথে আমি হাতলটা আরো গভীরে ঢোকাতে ঢোকাতে নেশাগ্রস্থের মতো বলতে লাগলাম
"কোথায় তোদের রাজা পিকারাস ,বল হারামজাদা ,শিগরির বল, নাহলে তোকে আমি মরতেও দেবোনা , বল জলদি ........"
হিমো বাকি দুটোকে শুইয়ে রেখে আমার দিকে আসছিলো , এমন সময় আকাশ ফাটিয়ে একটা বাজ পড়লো আমাদের সামনে , আমি হিমো দুজনেই ছিটকে পড়লাম , বালির চরে সঙ্গে সঙ্গে যেন একটা ঘূর্ণি ঝড় উঠলো , কাদা জল বালি হওয়ার তোড়ে উড়ে আসতে লাগলো। কিছুক্ষণ পরে সব শান্ত হতে দেখলাম , দাগনাসদের জাহাজটা এর মধ্যেই অনেকটা দূরে সরে গেছে এবং আরো দ্রুত সরে যাচ্ছে , সব থেকে বাজে ব্যাপার জাহাজটা জলে ভেসে যাচ্ছে না জল থেকে কয়েকফুট ওপর দিয়ে
ভেসে চলে যাচ্ছে, আমি উঠে বসলাম , চাবুকটা আমার হাতে তখনো ধরা।
হিমো আমার কাছে এসে বললো
" দুঃখিত বন্ধু , তুমি এখনো তৈরী হওনি , এই পৃথিবীর মায়া ,এই মাত্রার মায়া তোমাকে আবার দুর্বল করে দিয়েছে "
বলেই একটানে আমার গলা থেকে হার থেকে লকেট টা ছিঁড়ে নিলো , আবার আমার পা থেকে মাথা অব্দি একটা আগুনের গোলা লাফিয়ে উঠলো , এবারে আর সহ্য করতে পারলাম না , একেবারে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলাম।
(চলবে )
বি দ্র - আবার আসিয়াছি ফিরে , লেখাটা ভালো লাগলে please
share
No comments:
Post a Comment