Search This Blog

Friday, 15 September 2017

অশরীরীদের রাজত্ব

কলকাতার তিনশো বছরের  ইতিহাসে বহু অলৌকিক ও অস্বাভাবিক  ঘটনা খুঁজে পাওয়া যায়। প্রাচীন সময়ের   অশরীরীরা শহরের অনেক জায়গায়  এখনো নাকি দাপিয়ে  বেড়ায়। বেশিদিনের কথা নয় ৩১শে মার্চ ভেঙে পড়েছিল বিবেকানন্দ রোডের ফ্লাইওভার , তারপরে  কেটে গেছে  প্রায় দু বছর  কিন্তু এখনো নাকি গণেশ টকিজ এলাকায় দিনরাতে কোনো কোনো আগন্তুক স্থানীয়দেরজল  চাইছেন! প্রবল গরমে জল চাওয়াটাই স্বাভাবিক, কিন্তু তা  দিতে গিয়েই যেন হুঁশ ফেরে, চোখের পলকে আগন্তুক উধাও!  দু-একজন নয়, এরকম অভিজ্ঞতা হয়েছে অনেকেরই। এখানেই শেষ নয়! একই এলাকা থেকে ট্যাক্সিতে উঠেছেন যাত্রী। কিছুটা এগোতেই চালক পেছন ফিরে দেখেন খালি ট্যাক্সি; আসনটাই যে ফাঁকা! তাহলে একটু আগে ওঠা যাত্রী গেল কোথায়? এমন কিছু কি সত্যিই হচ্ছে? ঘটনার সত্যতা নিয়ে বাড়ছে রহস্য।

শহর কলকাতার ইতিহাস ঘেঁটে জোগাড় করা গেল কয়েকটা বিখ্যাত জায়গার খবর ,যেখানে পুজো ডুবলেই শুরু হয় অশরীরীদের রাজত্ব ,



কলকাতা মিউজিয়াম
কলকাতার ভুতুড়ে জায়গাগুলির মধ্যে  অন্যতম ভারতীয় জাদুঘর। ১৮১৪ সালের ২ ফেব্রুয়ারি নির্মিত  মিউজিয়ামটি নিয়ে  জল্পনাকল্পনার কমতি নেই.  পাশের রাস্তাটি অর্থাৎ সদর স্ট্রিটে  আজ থেকে প্রায় ২০০ বছর থাকতেন ওয়্যারস্ট্রিংসের স্পিক সাহেব।এই  স্পিক সাহেবের কাছে এক বিশেষ আরজি নিয়ে এসেছিলেন এক শিখ যুবক, কৃতকার্য না হওয়ায় তিনি চড়াও হন সাহেবের ওপর হঠাৎই শোনা গেল রাইফেলের তীব্র শব্দ। লুটিয়ে পড়ল যুবকের রক্তাক্ত দেহ। রাত বিরাতে এ স্মৃতি নাকি এখনো ফিরে আসে। শোনা যায় গুম গুম শব্দ। এখানেই শেষ নয়। গভীর রাতের অন্ধকারে কে যেন কাপড় মুড়ি দিয়ে আজও বেড়িয়ে যায়। কাঠের বাক্সে শুয়ে রাখা নিথর মমিতেও এমন কাহিনী কম নেই। এখনো নাকি মধ্যরাতে নর্তকীর নাচের শব্দ ভেসে ওঠে। কে বা কারা এসব ঘটনার সৃষ্টি করছে আজও সবার কাছে অজানা। এমনি সব ভয়ঙ্কর ও রহস্যময়ী ভুতুড়ে কাহিনী  লিখেছিলেন অবনিন্দ্রনাথ ঠাকুর! যে লেখার পাণ্ডুলিপি আজও মিউজিয়ামে সংরক্ষিত।


সাউথ পার্কস্ট্রিট সিমেট্রি
 শহরের  নিমতলা, ক্যাওড়াতলা শ্মশান ঘাট খানিকটা আলোময় দেখালেও শহরের প্রাচীন সিমেট্রি ও কবরখানাগুলো  এখনো অন্ধকার। সাউথ পার্কস্ট্রিট সিমেট্রি  একটি বিখ্যাত  গোরস্থান। প্রতিষ্ঠা করা হয় ১৭৬৭ সালে। আবছা অন্ধকার, স্যাঁতস্যাঁতে দেয়াল আর ঘন গাছপালায় ঘেরা গোরস্থানে গেলেই গা ছম ছম করে ওঠে।শোনা যায়, রাত হলেই নাকি কফিন থেকে জেগে ওঠে শত বছরের পুরনো আত্মা। একবার তো ঘটেই গেল বিপত্তি। সন্দীপ রায়ের ফেলুদা সিরিজের ‘গোরস্থানে সাবধান’-ছবির শুটিংয়ের উদ্দেশ্যে একবার সিমেট্রির দরজা খোলা হয়েছিল। ব্যাস উলটপালট করে দিল শুটিং সেটে থাকা সবার মন। অদ্ভুত সব শব্দ আর ছায়ায় ভয়ে শিহরিত হয়ে উঠল সবাই। এরপর থেকে আজ অবধি কেউ সেখানে ভুলেও পা বাড়ায়নি। এরকম আরও একটি সেমিট্রি রয়েছে লোয়ার সারকুলার রোডে। ঠিক আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসু রোডের ওপরে। পর্যটকরা ঘুরতে আসেন ঠিকই কিন্তু রাত হলে ঢোকার সাহস হয় না কারও। এক পর্যটক ছবি তুলতে গিয়ে সাদা পোশাকের আবছা মহিলাকে দেখে অসুস্থ হয়ে পড়েন। পার্ক সার্কাসের বিশাল কবরখানার মতো স্থান, এ শহরে খুব কম রয়েছে। পার্কস্ট্রিটের আশপাশেরর স্থানীরা খুব সকালে এবং সন্ধার পর তাদের জানালা বন্ধ করে রাখেন। 
 
রয়্যাল ক্যালকাটা টার্ফ ক্লাব
 ক্যালকাটা টার্ফ ক্লাব খ্যাত রেসকোর্স ময়দান ,রাতে এখানে ঘটে যায় অলৌকিক সব ঘটনা। কে বা কারা যেন ঘোড়া নিয়ে ছুটে বেড়ান এখানে। স্পষ্ট দেখতে পাওয়া ঘোড়া নিমিষেই বাতাসে মিলিয়ে যায়। পেলেও ইতিহাসে রয়েছে একটি কাহিনী। একবার এক ব্রিটিশ জর্জ উইলিয়ামস তার প্রাইড নামের  বিখ্যাত সাদা ঘোড়া নিয়ে ময়দান চষিয়ে বেড়াতেন।  প্রচুর রেস আর ট্রফি জেতায়, প্রাইডকে তখনকার সময় এক নামেই চিনত কিন্তু একবার অ্যানুয়াল টার্ফি টুর্নামেন্টের আগে আকস্মিকভাবেই প্রাইড অসুস্থ হয়ে পড়ে। উইলিয়ামস প্রাইডের প্রচুর যত্নআত্তি করেও লাভ হয়নি। যার ফলাফল অ্যানুয়াল ট্রফি হেরে যান। এরপরই একদিন সকালে জর্জ দেখে, খোলা ট্রাকের ওপরে মরে পড়ে আছে তার প্রিয় সাদা ঘোড়াটি। প্রাইডের শোক আর মায়ায় জর্জও বেশিদিন পৃথিবীতে ছিলেন না। কিন্তু এখনো প্রত্যেক শনিবার পূর্ণিমার রাতে দেখা যায় জর্জ ও প্রাইডকে। রেসকোর্সজুড়ে সে বীরবিক্রমে পরিক্রম করে। 
 
ন্যাশনাল লাইব্রেরি
 কলকাতার ন্যাশনাল লাইব্রেরি। বইয়ে ঠাসা লাইব্রেরিতে সন্ধ্যা নামলেই যার রূপ পালটে যায়। অন্ধকারে এর মাঠ পেরিয়ে নাকি ছুটে যায় অশ্বারোহী। বলডাস্কের ভিতর থেকে নাকি ভেসে আসে কনসার্টের করুণ সুর। শোনা যায় পালকির আওয়াজ। কে যায় কিংবা কার সুরেলা কণ্ঠে ভেসে আসে। কোনো সদুত্তর নেই। তবে ইতিহাসের কিছু ইঙ্গিত আছে। ১৭ আগস্ট ১৭৮০, সেদিন সকালে এখানে ডুয়েল শুরু হয় রয়্যাল হেস্টিংস আর ফিলিপ ফ্রান্সিসের। এখনো সন্ধারাতে গা ছমছম করে লাইব্রেরির করিডর বরাবর হেঁটে গেলে। অনেকে নাকি সেই অশরীরী আত্মাদের স্বচক্ষে প্রত্যক্ষও করেছেন। কেউবা শুনতে পান পায়ের আওয়াজ, কেউবা আবার ঘন ঠাণ্ডা শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুভূতি টের পান। রাতে লাইব্রেরির গার্ডরা বইয়ের পাতা ওল্টানোর আওয়াজও পান।

রাইটারস বিল্ডিং
 সরকারি কাজের দরকারি দপ্তর। সন্ধ্যার পর কেউই এই বাড়িটিতে থাকার সাহস দেখান না। যারা রাত কাটিয়েছেন, তাদের অনেকেই মাঝরাতে হঠাৎ কান্না, হাসি কিংবা চিৎকারের শব্দ শুনতে পেয়েছেন। নাইট গার্ডরা বলেন এখানের পাঁচ নম্বর ব্লক জায়গাটা নাকি সুবিধের নয়। বারান্দা দিয়ে কারা যেন হেটে বেড়ায়। শোনা যায় টাইপের শব্দ। মনে হয় খুব মনোযোগ দিয়ে কারা যেন কাজ করছেন। দোতলায়র সিড়িতে কারা যেন ভেসে উঠেই মিলিয়ে যায়। হঠাৎ করে কে যেন চিৎকার করে ওঠে। ইতিহাস বলে এখানেই এক সময় ছিল ভাং আর কলা গাছের জঙ্গল। একবার বেশ কয়েকজন ব্রিটিশকে এখানে কবর দেয়া হয়ছিল। লর্ড ভ্যালেন্টিনের  লেখায় তথ্য মেলে দিল্লি থেকে আসা নব্য রাইটারদের মধ্যে ঘোড়ায় টানা গাড়ির খেলা কিংবা ডুয়েল চলতো। এতে করে সর্বদাই লেগে থাকতো খুন জখম। বিনয়, বাদল, দিনেশের হাতে কর্নেল সিমসনের ঘটনাও কি ফেলে দেয়া যায়! 



হেস্টিং হাউস
পরাধীন ভারতের গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস বাড়িটি তৈরি করে এখানে থাকতেন। বর্তমানে এটি কলকাতা ইউনিভার্সিটির ওম্যান্স কলেজ। রাতে ঘটে যতসব অলৌকিকতা। ঘোড়ার গাড়ি ছুটিয়ে আসতে দেখা যায়  ওয়ারেন হেস্টিংসকে   ঘরে ঢুকে ব্যস্ততার ছলে বিরক্তি নিয়ে ফাইলপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করেন। আবার এমনও দেখা যায় ঘোড়া হাঁকিয়ে চলে যান। এই তো বেশ কিছুদিন আগের ঘটনা নতুন বছরের মধ্যরাতে হেস্টিংস হাউসে নিউ ইয়ার পার্টি চলে বলে শোনা যায়। একই রকমভাবে ফুটবল খেলতে আসা এক শিশুর মৃত দেহ উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া এখানে পাওয়া অপঘাতে মৃত্যুর লাশ। লাশগুলো ছিল কাটাছেঁড়া। আবার এ জায়গা সম্পর্কে শোনা যায়, অশরীরী আত্মারা সবচেয়ে বেশি এখানেই ঘোরাঘুরি করে।
 
পুতুলবাড়ী
 এটা কলকাতা শহরের সবচেয়ে রহস্যজনক স্থান। গভীর রাতে তো বটেই এমনকি ভরদুপুরেও কিছু অশরীরীর উপদ্রব রয়েছে এখানে। এর নেপথ্যে আসলে কি! এক সময় বাড়িটিতে এক বড়লোক মনিব বাস করতেন। বাড়ি দেখাশোনায় কয়েকজন দাসীও কাজ করত। মনিব দাসীদের সঙ্গে জোরপূর্বক যৌনসম্পর্ক করতেন। কিছু দাসী মনিবের এ অত্যাচারের প্রতিবাদ করায় তাদের হত্যা করা হয়। হত্যার পর বাড়ির পেছনে তাদের লাশ মাটি চাপা দেওয়া হয়েছিল। এরপর কতকাল পার হলো কিন্তু আজ অবধি মাঝে মাঝে রাতে মেয়েলি কণ্ঠের অশরীরীদের কান্নার শব্দ শোনা যায়। স্থানীয়দের ধারণা মনিবের এ পাপের কারণে এখনো পুতুলবাড়ীতে অশরীরী আত্মার আনাগোনা।



আকাশবাণী
 আকাশবাণীর পুরনো দফতরে   বারবার দেখা গিয়েছে অশরীরী আত্মা। ফাঁকা লম্বা করিডর, অজস্র স্টুডিও আর ব্রিটিশ অবকাঠামো মিলিয়ে আকাশবাণীর ভুতুড়ে অস্তিত্ব অস্বীকার করা যায় না। আকাশবাণীর প্রথম দফতর উঠে যাওয়ার পর গারস্টিন প্লেস ভোল বদলেছে। এক সময়ের জনপ্রিয় রেডিও স্টেশন ছিল এটি। কেউ কেউ এখানে দেখেন হ্যাট-কোট পরিহিত, সিগারেট মুখে ইংরেজ সাহেবদের ছায়া যারা মাঝে মধ্যেই ঘরে প্রবেশ করতেন আর অভ্যেসবশত ফাইলপত্র নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতেন। আবার কেউ কেউ দেখেন মধ্যরাতে রেকর্ডিং রুমের বারান্দায় কে যেন গান শুনছেন।এখনো  স্টুডিও থেকেই রাতে ভেসে আসে যান্ত্রিক সুর। বলাই বাহুল্য, সেই যন্ত্রগুলো কোনো মানুষ বাজায় না।

উইপ্রো অফিস
কাগজ উলটপালট করা, একটি বস্তু এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়া এখানকার প্রতিদিনকার কাণ্ড। কলকাতার উইপ্রো অফিসের নৈমিত্তিক ঘটনা এটি। অফিসের চতুর্থ তলায় নাকি ভূতদের আড্ডাখানা। সল্টলেকের অফিসটির আগের ইতিহাসটি  ভয়াবহ।পরিত্যক্ত কবরখানার ওপর গড়ে ওঠা এই অফিসর   আগে এখানে ছিল জলাশয় আর জঙ্গল। ধর্ষণ, হত্যা, অত্যাচার,  কিছুই চলত এখানেঅনেকে এখানে আত্মহত্যাও করত।  মূল অফিসটি কবরখানার উপরে তৈরি। রাতে নাইটগার্ডরা ভয়াবহ অভিজ্ঞতার শিকার হন। অফিসের চার তলা থেকে নাকি চিৎকার, শোরগোল শোনা যায়। এমনকি রাতে রক্তাক্ত মেয়ের ছায়া আর কান্নায় গোটা উইপ্রো অফিস কেঁপে ওঠে। 

 
পৌরসভা কার্যালয়
 গোটা কলকাতা ভুতুড়ে রহস্যেঘেরা। তার মধ্যে কলকাতা মিউনিসিপাল করপোরেশন বাড়িটি অন্যতম। উনিশ শতকের এই লাল বাড়িটি শহর কলকাতার ব্রিটিশদের বহু ঘটনার রাজ সাক্ষী। রাত ৩টা বাজলে নাকি এখানেও একটু বেশি থম থমে। পৌরসভার এই বাড়িটিও অনেক আশ্চর্যের কেন্দ্রবিন্দু। অনেকেই এখানে বিচিত্র সব আওয়াজ আর ভৌতিক ঘটনার মুখোমুখি হন। পৌরসভার লাল বাড়িটির ভিতর প্রায়শই মহিলা কণ্ঠে কান্নার শব্দ শোনা যায়।
 
হাওড়া ব্রিজ
 মল্লিক ঘাট শহরের প্রধান ফুলের বাজার।কিন্তু জায়গাটি বিশেষ সুবিধার নয়  । বহু প্রেতাত্মা ঘুরে-বেড়ায় হাওড়ার চারপাশজুড়ে। কলকাতা শহরে  আত্মহত্যার প্রবণতা হামেশাই ছিল। শহরের যতগুলো আত্মহত্যার জায়গা রয়েছে তার মধ্যে হাওড়া ব্রিজ অন্যতম,একে কেন্দ্র করে ভয়ার্ত পরিবেশ সব সময়েই ছিল। হাওড়া ব্রিজ থেকে প্রচুর মানুষ গঙ্গায় ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। মল্লিক ঘাটে যেসব কুস্তিবিদ ভোররাতে মুগুর ভাজতে গঙ্গার পাড়ে যায়, তাদের কাছে এই দৃশ্য খুব স্বাভাবিক। দেখা যায়, কেউ যেন ডুবে যাচ্ছে, আর পানির ওপর একটা হাত ছটফট করছে। কেউ যদি বাঁচাবার উদ্দেশ্যে ঝাঁপ দেয় তাহলে তারও প্রাণ শেষ। ধারণা করা হয় আত্মহত্যার কারণে অনেকের আত্মা মুক্তি পায় না। এসব আত্মা কিংবা অশরীরী মানুষকে আত্মহত্যায় প্রভাবিত করে।

 রবীন্দ্র সরোবর মেট্রো স্টেশন 
মেট্রোর লাইনে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যার ঘটনা কলকাতায় নতুন কিছু নয়। আর সেইসব আত্মহত্যার ৮০ শতাংশই রবীন্দ্র সরোবর স্টেশনে ঘটেছে। সেইসব মানুষদেরই আত্মা নাকি এই স্টেশনে সন্ধের পরে আড্ডা বসায়। রাত্রে এই স্টেশন থেকে শেষতম মেট্রোতে চড়েছেন যাঁরা তাঁরা অনেকেই দাবি করেন, ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করার সময়ে প্রায়-নির্জন স্টেশনে তাঁরা বিভিন্ন ছায়ামূর্তিকে ঘুরে বেড়াতে দেখেছেন এমনকি যারা ওই শেষ মেট্রোতে ফেরেন তাদের অনেকেই জীবিত নন ,অনেকে দেখেছেন মেট্রোর সুড়ঙ্গে বা জানলার কাঁচে আবছায়া মূর্তিকে দেখা দিয়েই মিলিয়ে যেতে। 



সঙ্গে রইলো ফাউ হিসাবে কয়েকটি শহুরে কিংবদন্তি (urban legends)
সব শহরেই নিজস্ব কিংবদন্তি থাকে। চরিত্রগতভাবে তাদের মধ্যে মিলও থাকে। কিন্তু শহরভেদে বদলে যায় তাদের রকম,তেমনই আমাদের কলকাতার আরবান লিজেন্ড ঘাঁটতে বসলে ভয়ের যে কানাচগুলো উঠে আসে, তা একেবারেই এক্সক্লুসিভ। ভারতের অন্য শহরে তাদের দেখা মিলবে না।

নিশি
 :  নিশির ডাকের গল্প কলকাতায় বিপুল জনপ্রিয়তা পায় বিংশ শতকের গোড়ায়। বলা হয়, নিশুত রাতে যখন গভীর ঘুমে শহর মগ্ন তখন জানলার কাছে কেউ নাম ধরে ডাকবে। তার কণ্ঠস্বর শুনলে মনে হবে, একান্ত পরিচিত জনই ডাকছে। সে নাকি তিন বার ডাকে। তার সেই ডাকে সাড়া দিলেই বিপদ। মৃত্যু সুনির্ঘাত। কাপালিকরাই নাকি নিশিডাকের পাণ্ডা। তারা হাতে একটা মন্ত্রপূঃত মুখকাটা কচি ডাব নিয়ে এই মায়াডাকটি ডাকে। যাকে তারা খতম করতে চায়, সে তিনটি ডাকের একটিতে সাড়া দিলেই তারা সেই ডাবের কাটামুখটি ঝপ করে বন্ধ করে দেয়। আর তাতেই সাড়া প্রদানকারীর ভবলীলা সাঙ্গ। কিন্তু এতে সেই কাপালিকের কী লাভ?  এ নাকি এক ঘোর অপসাধনা। এমন ১০৮টি খতমকাণ্ড ঘটাতে পারলেই নাকি কাপালিকের পোয়াবারো। সিদ্ধি একেবারে হাতের মুঠোয়। নিশির ভয়  আজও সচল এই শহরে।


হিরামোতি রাক্ষুসী:
 ১৯৪০-এর দশকে তারা হানা দিত সাঁঝবেলায়, মূলত উত্তর কলকাতার গলি-উপগলির ভিতরে। সন্ধে লাগার আগে বাচ্চারা বিনা ঝামেলায় দুধ খেয়ে নিত , বড়রা বলতো  হিরামোতি  অবাধ্য বাচ্চাদের তার ঝোলায় পোরে। তার পরে তাদের নিজের ডেরায় নিয়ে যায়। সেখানে নিয়ে গিয়ে তাদের কী করে, তা অবশ্য কোনও দিনই জানা যায়নি। সন্ধে ঘনাতো কাঠ আর কয়লার উনুনের ধোঁয়ায়, শহরের উপগলির ভিতরে গ্যাসের বাতির ক্ষীণ আলো ঘুলিয়ে উঠত। আর সে আসত। পায়ের ঘুঙুরে ঝম ঝম শব্দ তুলে । তার মুলোর মতো দাঁত, কুলোর মতো কান নিয়ে সে এসে দাঁড়াত গৃহস্থের সদর দরজায়। তার পরে হাত পাততো। গৃহকর্তা পয়সা দিলে চলে যেত । আসলে হিরামোতি ছিল এক বিশেষ শ্রেণির বহুরূপী। বাগবাজার, আহিরীটোলা, শোভাবাজার, এমনকী পটলডাঙাতেও ছিল তার অবাধ গতি। তার প্রকৃত সত্যটা জানলেও বাড়ির অভিভাবকরা ভয়টিকে  বজায় রাখতেন অবাধ্য কনিষ্ঠদের জব্দ করতে।

স্টোনম্যান: সে ভূত নয়। অশরীরীও নয়। তবু তার ভয়ে সিঁটিয়ে থেকেছে শহরবাসী। ১৯৮৯-এর জুন মাসে ফুটপাথবাসী জনৈক ব্যক্তিকে ঘুমন্ত অবস্থায় কেউ পাথর দিয়ে মাথা থেঁতলে দেয়। এর পর থেকে ক্রমান্বয়ে চলতে তাকে একের পরে এক সিরিয়াল কিলিং। পুলিশ বিরাট ধন্ধে পড়ে। অজানা খুনির নাম দেওয়া হয় ‘স্টোনম্যান’। তাকে খুঁজতে গিয়ে গ্রেফতার হন বেশ কিছু ভবঘুরে। গণধোলাই জোটে কিছু নেশাখোরের ভাগ্যে। রাতে পুলিশের টহলদারি বাড়। পাড়ায় পাড়ায় গড়ে ওঠে নৈশ প্রহরার বাহিনী। কিছুদিন আতঙ্ক ছেয়ে থাকার পরে আপনা থেকেই বন্ধ হয়ে যায় স্টোনম্যানের তাণ্ডব। 


 ব্যান্ডেজ ভূত: বর্ণনা থেকে জানা যায়, তার চেহারা মিশরের মমির মতো। অর্থাৎ কিনা তার সর্বাঙ্গ ব্যান্ডেজ দিয়ে মোড়া। সে নাকি পাবলিক টয়লেটে ওৎ পেতে থাকে। ঝুঁঝকো আঁধারের রাতে সে রাস্তাতেও বিচরণ করে। ১৯৮০-র দশক থেকে ১৯৯০-র দশকের গোড়া পর্যন্ত যত্রতত্র ঘুরে বেরিয়েছে তার কাহিনি। সে নাকি সরাসরি এসে গলা টেপে। রাতের ফাঁকা লোকাল ট্রেনেও নাকি দেখা গিয়েছে তাকে।






Thursday, 14 September 2017

প্রতিবিম্ব



    
প্রতিবিম্ব 


দিতি আর সুগত  মুখোমুখি বসেছিলো ,কফিহাউসের দোতলার বারান্দার একদম কোনের শেষের  টেবিলটায় ,সুগত নিজের ট্যাবটা খুলে  কিছু একটা দেখছিলো আর দিতি অলস আঙুলে চামচ জড়িয়ে কফির কাপে চিনি মেশাচ্ছিলো , সুগত লাস্ট  দশ মিনিট ধরে ট্যাব খুলে কিছু একটা হিসাব করে যাচ্ছে আর সেটা মেলানোর জন্যই বোধহয় বারবার ঘড়ি দেখছে। দিতি খুব ভালো করে জানে  যে  এই সময় সুগতকে কিছু  জিজ্ঞাসা করাটা  বেকার তাই কফির কাপ থেকে চামচটা তুলে  প্লেটে ওপর রাখলো, টুং করে একটা শব্দ হল।এবার  সুগত  নিজের ট্যাবটা টেবিলে রেখে একপলক  দিতির দিকে তাকালো  তারপর পিছন দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে  বলল "মাকসুরদা এক প্লেট চিজ স্যান্ডুইচ আর একটা মটন কবিরাজি, একটু জলদি কর    "
দূরে মাকসুরদা হাত নেড়ে জানাল   হয়ে যাবে। দিতি হেসে ফেললো , মটন কবিরাজী আর চিজ স্যান্ডুইচ  দুটোই ওর খুব প্রিয় , নাহ এবারও সুগতর ওপর রাগ করে থাকা গেল না, দিতি বলল
 "কি দেখছিলে এতক্ষন ?"
 "একটা আর্টিকেল পড়ছিলাম , কলকাতার দশটি ভুতুড়ে জায়গা।ন্যাশনাল লাইব্রেরী , আকাশবাণী ভবন ,রবীন্দ্রসরোবর মেট্রো........."
 "তাই , তা সেই লিস্টে  কি  কফি হাউস  আছে?"
" নাহ এই লিস্টে তো দেখছিনা ,অন্য কোথাও থাকলেও থাকতে  পারে ,এতদিনের পুরানো বাড়ি ভুতুড়ে হতেই পারে  "
"হলে কিন্তু মন্দ হয়না বলো "
"হুঁ.....তা হয়না। ......
 সুগত আবার নিজের ঘড়িটা দেখলো , দিতির ভ্রুটা কুঁচকে গেল , ব্যাপারটা কি !
" আজ এতো ঘনঘন ঘড়ি দেখছো কেন? অন্য কোথাও যাবার আছে বুঝি ?"
সুগত এবার হেসে ফেললো তারপর টেবিল থেকে কাপদুটো একটু সরিয়ে ,নিজের হাতদুটো  বাড়িয়ে দিতির একটা হাত নিজের মধ্যে নিল,দিতির গালে চট করে  একটা হাল্কা বেগুনি রং খেলে গেল।  নিজের দুই কনুই টেবিলের ওপর ঠেকিয়ে দিতির চোখে চোখ রেখে সুগত বলল ,
 " একটা মজা দেখবে ?"
দিতি  এবার চোখদুটো বড়োবড়ো করে চশমার ওপর দিয়ে তাকালো ,সুগতর এই ভঙ্গিটা ওর খুব চেনা , সন্ধ্যেবেলা এই সময় অন্যদিন কফি হাউস গম গম করে কিন্তু  আজকে সেই দুপুর  থেকে টানা বৃষ্টি পড়ে চলেছে তাই  নিচের তলায় ভিড় থাকলেও ওপরের বারান্দার এই দিকটা একদম ফাঁকা। এক সেকেন্ডের জন্য দিতির ইচ্ছা হল সুগতর হাত থেকে নিজের হাতটা  ছাড়িয়ে  নিয়ে দৌড়ে পালিয়ে যায় , কিন্তু সেটা ভাবতেই ও হেসে ফেলল ,ধুৎ সুগতর পাল্লায় পড়ে দিনকে দিন ওর মাথাটা যাচ্ছে। মাকসুরদা এসে চিজ স্যান্ডুইচ আর মটন কবিরাজির প্লেটদুটো দিয়ে গেল।
সুগত বলল
"থ্যাংকু মাকসুরদা , একদম ঠিক সময়ে এসেছো , খুব খিদে পেয়েছিলো গো , আর শোনোনা শেষে একটা কোল্ড কফি দিয়ে যেও কেমন "
মাকসুরদা এই জোড়টিকে বিলক্ষণ চেনে তাই ঘাড় নেড়ে হ্যাঁ  বলে  মুচকি হেসে চলে গেল। মাকসুরদার চলে যাবার দিকে তাকাতেই দিতি দেখতে পেল , একজন এই  দিকেই আসছে ,বোধহয় পাশের টেবিলটাতেই বসবে , একা আছে? না পিছনে আরো একজনকে দেখা যাচ্ছে। দিতি ঘাড় সোজা করে সুগতর মুখে চোখ রাখলো , সুগতর চোখদুটো যেন জ্বলজ্বল করছে উত্তেজনায় ,দিতি এবার সুগতর হাতদুটো  শক্ত করে আঁকড়ে ধরলো।  পাশে চেয়ার টানার শব্দ হল, দিতি সুগতর  মুখ থেকে আর চোখ ফেরালো না ।






 সিঁড়ি দিয়ে দোতলায়  উঠে আবির প্রথমে একটু অবাকই হল , এই  দিকের বারান্দাটা প্রায় রোজকার মতো খালি বললেই চলে ,কিন্তু  একদম শেষের টেবিলটায় বসে একজোড়া ছেলেমেয়ে প্রেম করছে , আবির ওদের দিকেই এগিয়ে গেল।  বেয়ারা ওদের খাবারগুলো দিয়ে আবিরের পাশ  দিয়ে মুচকি হেসে চলে গেল, হাসিটা কেমন যেন একটু চেনা চেনা লাগলো ,পিছনে ফিরে বেয়ারাটাকে  ভালো করে দেখতে গিয়ে দেখলো সোমনাথ কখন  উপরে উঠে এসেছে  আবিরকে  দেখতে পেয়ে ,হাত নেড়ে ওর দিকে এগিয়ে আসতে  লাগলো।
" সেই কখন থেকে বৃষ্টি নেমেছে শালা থামার কোনো নাম নেই , ভিজে পুরো  কাক হয়ে  গেলাম মাইরি"
"বাকিরা কোথায়?"
" রঞ্জন আর শ্যাম সিগারেট কিনে আসছে , তুই কতক্ষণ"
"এই কিছুক্ষন , আয় বসি "
সোমনাথ আর আবির চেয়ার টেনে বসলো। সোমনাথের গায়ের  পাঞ্জাবীটা  একদম  ভিজে গেছে  ,কাঁধের ঝোলাটাও ভিজেছে ভালো মতোই , বইপাগল সোমনাথ ঝোলা থেকে দুটো বই বার করে টেবিলের ওপর  রাখলো। আবির  একটা বই হাতে নিয়ে ওল্টাতে লাগলো , পুরানো বই একটু ভিজেও গেছে , শিবরাম চক্রবর্তীর গল্প সংকলন। সোমনাথ রুমাল দিয়ে নিজের মাথা মুছছিলো , এবার চশমার কাঁচটা মুছতে মুছতে খুব করুন ভাবে  বলল
"ভাই একটা কফি বল আগে নাহলে সর্দি হয়ে মারা পড়বো  আবার"
আবির ওর কথা বলার ধরনে , হেসে ফেললো ,
"আরে বলছি বলছি "
হাত তুলে বেয়ারাকে ডাকতে গিয়ে দেখে কাছাকাছি  কেউ নেই , ওপরতলাটা একদমই ফাঁকা সব বোধহয় নিচে পালিয়ে গেছে , আবির চেয়ার ছেড়ে উঠে  দাঁড়িয়ে বলল
"কাউকে তো দেখছিনা রে ভাই দাঁড়া আমি বরং নিচে গিয়ে বলে দিয়ে আসছি। "
"তাহলে ছাড় বাদ দে , ওরা আসুক তারপর নাহয় একসাথে অর্ডার করা যাবে , তুই ততক্ষন একটা সিগারেট দে তো "
আবির বসে পড়ল , সোমনাথকে একটা সিগারেট দিয়ে নিজেও একটা ধরালো। বুদ্ধির গোড়ায় ধোঁয়া দিতে দিতে
 পাশের টেবিলটায় চোখ গেল , ছেলেটা আর মেয়েটা টেবিলের ওপর দিয়ে হাত ধরাধরি করে বসে একে অন্যের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ,সামনে প্লেট ভর্তি খাবার ,কফির কাপ থেকে ধোঁয়া উড়ছে  দুজনের কারুর তাতে কোনো হুঁশ নেই , দুজনকে দেখে তো কলেজে পড়ে বলেই মনে হচ্ছে , অবশ্য ওই বয়সটাই এমন কোনো কিছুর হুঁশ থাকেনা। আবির নিজেও কি  কিছু কম  করেছে নাকি কলেজ জীবনে , পুরানো সেসব কথা মনে আসতেই ঠোঁটের কোনে একটা হালকা হাসি খেলে গেলো। ওরা চারজন বন্ধু , আবির ,সোমনাথ ,রঞ্জন আর শ্যামলাল ,  হেয়ার স্কুলের চার বিখ্যাত বিচ্ছু , সেই ক্লাস ইলেভেন  থেকে কফি হাউসেই  ওদের আড্ডা-অবস্থান ,পরে কলেজ আলাদা হয়ে গেলেও বন্ধুত্বে টান  বিশেষ পড়েনি , এখন সবাই যে যার কাজ  ,জীবন এসব নিয়ে  ভীষণ ব্যাস্ত কিন্তু তাও  নিয়ম করে মাসে অন্তত
 দু-তিনবার  ওরা কফি হাউসে আসবেই আড্ডা দিতে।
"কিরে শালা টান্টু মেরে এসেছিস নাকি? উঠমুখো হয়ে কি ভাবছিস ? আঙুলে যেএবার ছেঁকা  লাগবে "
সোমনাথের কথায় হুঁশ হলো আবিরের ,    সত্যিই তো সিগারেটটা পুড়তে পুড়তে অনেকটাই  নেমে এসেছে , তাড়াতাড়ি সেটাকে অ্যাশট্র্যেতে সমাধি দিতে দিতে দেখলো শ্যাম আর রঞ্জন এসে গেছে ,হাত তুলে ওদের ডাকলো
"এই যে এই দিকে "
ওরা তাড়াতাড়ি করে এসে চেয়ার টেনে বসলো
রঞ্জন বলল
"কিরে কুমড়ো কেমন  আছিস , আরো ফুলেছিস মনে হচ্ছে "
সোমনাথ বইয়ের পাতা ওল্টাচ্ছিলো , বইটা টেবিলে নামিয়ে রেখে গম্ভীরভাবে বললো
"এই যে আমাকে ক্রমবর্ধমান কুমড়ো বললি , এই জন্য আজ তুই একটা কফি বেশি খাওয়াবি "
সবাই হেসে উঠলো ,রঞ্জন আর সোমনাথের এই খুনসুটিটা সবাই খুব মজা পায় , এমন কি ওরা দুজনও পায়।
শ্যাম বলল
"কি বই রে ওটা একটু দেখি  ?"
"শিব্রাম চকোত্তির গপ্পো "
সোমনাথ বইটা এগিয়ে দিতে দিতে বলল
"জানিস শিব্রামের একটা গপ্পো আছে  'গোলদীঘির ভূত' , সেটাতে এই.......
রঞ্জন বাধা দিয়ে বলল
"গোলদীঘি মানে আমাদের কলেজ স্কোয়ার ?"
"হ্যাঁ তাতে এই কফি হাউসের কথা আছে ,এখানেই লেখক একটা আইসক্রিম-খেকো। ....
  এবার বাধা দিয়ে আবির বলল
"পড়েছি ভাই গপ্পোটা  , সত্যি বলতে কি খুব একটা জমেনি ,কেমন যেন বিলিতি বিলিতি গন্ধ ছিল "
দু -দুবার বাধা পেয়ে সোমনাথ রেগে গিয়ে বলল
"দূর শালা গন্ধগোকুল গন্ধ পেয়ে পেয়েই গেল  , এই জন্যেই বাঙালি জাতটার কিস্যু হল না "
শ্যাম বইটা   টেবিলে রেখে সোমনাথের পিঠে একটা চাপড় মেরে বলল
"রাগিস না ভাই , নিচে মনোজদাকে বলে এসেছি এই ওপরে এলো বলে , এখন  ভূত -ভবিষৎ ছেড়ে বল তো কে কি খাবি।"
শ্যামের কথায় সবারই খাবারের কথাটা মনে ফিরে এলো , শনিবার হাফ ডে , সবাই কাজ থেকেই সোজা  এসেছে জোর  ক্ষিদে সবারই পেয়েছে।
আবির ক্ষিদে থেকে মন ঘোরানোর জন্য বললো " আজকে শনিবার তারওপর ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়ছে , এমন সন্ধ্যায় ভূতের গল্প ছাড়া  আর কি  জমে বল। "
রঞ্জন এতক্ষণ মুখ তুলে পিছনের টেবিলের ছেলে মেয়ে দুটিকে দেখছিলো , এবার আবিরের দিকে ফিরে  চোখ মেরে বললো
"প্রেম-লীলা "
সবাই ফের হেসে ফেললো
শুধু শ্যাম বললো
" এই আস্তে , ওরা শুনতে পাবে"
"তাতে আমার বয়েই গেছে "
সোমনাথ আবিরকে বলল
"বাছাধন ভূতের গপ্পোর ধুয়ো যখন তুমি তুলেছো তখন তুমিই জম্পেশ করে একখানা সত্যি ভূতের গপ্পো শোনাও তো দেখি "
আবির হালকা হেঁসে বললো "সত্যি কি মিথ্যে  জানি না , তবে হ্যাঁ  দিন কতক আগে আমার কলেজের এক পুরানো বন্ধুর সাথে দেখা হয়েছিল হাওড়া স্টেশনে , তার বাড়িও হাওড়াতেই ,প্রায়  ৩বছর পর দেখা তো ,ব্যাস পাকড়াও করে সোজা  বাড়িতে নিয়ে গেল ,তো সে একথা সেকথায় একটা গল্প শুনিয়েছিল সেটাই বলছি , আগেই বলছি গল্পটা আমার শোনা আর ঘটনাটা ঘটেছিলো,আমার বন্ধুটির  সেজকাকার  সাথে। ........"
বেয়ারা এতক্ষনে এসেছে মনোজদা নয় অন্য একজন , সে এসে জল ভর্তি গ্লাসগুলো রাখতে রাখতেই ওরা  অর্ডারটা  দিয়ে দিলো
চারটে কফি , দু প্লেট পকোড়া , চারটে মোগলাই পরোটা।
সোমনাথ বলল
"নে  ভাই বল। "
আবির আরেকটা সিগারেট  ধরিয়ে শুরু করলো
ঘটনাটা ঘটেছিল আমার বন্ধু গুপির সেজকাকা পিনাকী বিশ্বাসের সাথে ,তা সে অনেকদিন  আগের কথা তখন নকশাল আমল একদম শেষের দিকে ,আর   ওদের বাড়িটা  হাওড়ার যে জায়গাটায় সেখানে ফি  সপ্তাহে একটা লাশ পাওয়া খুব স্বাভাবিক বিষয় ছিল। পিনুকাকা কন্ট্রাক্টরির কাজ করতো ,  বাড়ি ফেরার সময়ের কোনো ঠিক ঠিকানা  থাকতো না , তখনও বিয়ে-সাদি  করেনি কাজেই  প্রায়শই মাঝ রাত হয়ে যেত বাড়ি ফিরতে। গুপিদের  বাড়িটা  গলির ভিতরে , বড়ো  রাস্তা থেকে হেঁটে  মিনিট সাত-আট লাগতো। বাড়িতে ব্যবস্থা করাই ছিল , নিচের ঘরে দরজার পাশে একজন বুড়ো চাকর ঘুমাতো মাঝরাতে  এসে দরজায় ধাক্কা দিলে সে খুলে দিতো।  তো তখন কাকার শ্যামপুরের দিকে একটা কাজ চলছিল ,  সেদিন ঢালাইয়ের দিন ছিলো , ঢালাইয়ের  কাজ ঠিক ভাবে হবার পর সবাইকে মাংস  খাওয়ানোর রীতি আছে , কাকা নিজে দাঁড়িয়ে থেকে সবাইকে খাওয়ালেন , তারপর মজুররা দিশি আর বাবুরা সবাই বিলিতির বোতল নিয়ে বসল। এইসব করে  সবকিছু   মিটিয়ে  কাকা যখন গলির মোড়ে গাড়ি থেকে নামলেন তখন রাত পৌনে একটা বাজে , এবার গরমকালে সেটা খুব একটা রাত না  হলেও তখনকার  সময়ের গুনে  রাস্তা পুরো শুনসান। গাড়ির ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে গ্যারাজে চলে গেল। পিনু কাকা গলির পথে পা বাড়ালেন , মদ তিনিও খেয়েছেন , অল্প নেশাও হয়েছে , মদ -মাংসের একটা ঢেকুর তুলে কাকা  একটা  ৫৫৫ সিগারেট ধরালেন, পা টা একটু  টলমল  করলেও মাথাটা একদম সাফ আছে , গুন্ গুন্ করে একটা গান গাইতে গাইতে পিনুকাকা হাঁটতে হাঁটতে হিসাব করছিলেন, এবার সামনের বাঁকটা পেরোলেই ভলিবল মাঠ তারপর মেছো পুকুর ,তারপরের মোড়টা পেরোলেই বাড়ির গলি  , পাঁচ মিনিটের বেশি লাগা উচিত নয় , ভলিবল মাঠ থেকে বাড়ির গলির  আগের মোড়টা  অব্দি রাস্তায় আলো  নেই ,বাল্বটা বোধহয় আবার চুরি গেছে , কুছ পরোয়া নেই   চেনা রাস্তা তাই সিগারেটে টান  দিতে দিতে কাকা হনহন করে এগিয়ে যাচ্ছিলেন । মেছো পুকুরের কাছাকাছি পৌঁছে খেয়াল করলেন পুকুরের ঘাটের কাছটায় কুন্ডলী পাকিয়ে কি যেন একটা পড়ে আছে , আবার একটা লাশ নাকি? অন্যদিন হলে কি করতেন কে  জেনে কিন্তু আজকে আলকোহলের দয়ায় কাকার সাহসের খামতি নেই তাই  সোজা এগিয়ে গেলেন সেদিকে , সামনের মোড়ের মুখের কাছটায় একটা আলো জ্ব্লছে বটে কিন্ত সেটার রেশ  পুকুরের ঘাট অব্দি পৌচচ্ছে না।  বেশি কাছে যাবার দরকার পড়ল না ,পুকুরের ঘাটের কাছটায় আলো মাখা আবঝা অন্ধকারে পিনুকাকা দেখলেন একটা লোক শুয়ে আছে ঘাড় উল্টে ,পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে না তবে লোকটার বড়ো-বড়ো চুল-দাঁড়ি-গোঁফ  আর গায়ের ছেঁড়া জামাকাপড় দেখে পাগল বলেই মনে হচ্ছে তবে ব্যাটা মরেনি দিব্বি নড়াচড়া করছে। পিনুকাকা একটা জোরে নিঃস্বাস ফেলে আবার নিজের বাড়ির দিকে পা বাডাতে যাবেন এমন সময় পাগলটা উঠে বসে বলল
"ওই বাবু একটু আগুনখান দ্যান না , বিড়িটা ধরতাম ",
কি আপদ , পিনুকাকা ঘাড় নেড়ে অতি কষ্টে জড়ানো গলায় বললেন
"আগুন নেই বাওয়া  "
"আপনার হাতের সিগারেটখান দ্যান না  "
এই কথাটায় কাকার দুম করে রক্ত গরম হয়ে গেল , ব্যাটার সাহস তো  কম নয় , একেবারে হাতের সিগারেট চাইছে
"নাহ হবে না " এটা বলেই কাকা আবার হাঁটা লাগালেন। কিন্তু পাগলটা পিছু ছাড়লো না , সে তড়াক করে লাফিয়ে উঠে কাকার পিছু-পিছু চলতে শুরু করলো , আর সাথে সেই ঘ্যানঘ্যানানি
"বাবু একটু আগুনটা দ্যান না , ও বাবু। .....বাবু গো "
এতো আচ্ছা ফ্যাসাদে পড়া গেল , পিনুকাকা কোনো জবাব  না দিয়ে আরো জোরে -জোরে হাঁটতে লাগলেন ,পাগলটাও পিছু পিছু যেতে যেতে  একনাগাড়ে বলে যেতে লাগলো
"ও বাবু , দ্যান একটু সিগারেটটা আপনার হাত থিকে ,.......ও  বাবু  দাঁড়ান না। ......আরে ...... ওই  বাবু।......
কি হলো কথাটা কানে যাচ্ছেনা নাকি , সিগারেটটা  চাইছি তো নাকি ,      ওই....দাঁড়া  বলছি সিগারেটটা দিয়ে যা
নাহলে  খুব খারাপ হবে কিন্তু "
অনুরোধ থেকে সোজা হুমকি ,পিনুকাকার এবার গা পিত্তি জ্বলে গেলো , সিগারেটটা শেষ হয়ে এসেছিলো ,সেটা  হতভাগাটার গায়ে ছুঁড়ে মারবেন বলে একঝটকায় পিছনে ঘুরে দাঁড়ালেন।  পিনুকাকা জোরে জোরে হাঁটার ফলে ততক্ষনে মোড়ের মাথায় চলে এসেছিলেন এবার স্ট্রিট লাইটের আলোয় তলায়  দাঁড়িয়ে দেখলেন ,স্ট্রিট লাইটটের আলোর বৃত্তটা   যেখান থেকে শুরু হয়েছে  পাগলটা  ঠিক সেখানে  দাঁড়িয়ে আছে , আর চোখদুটো হিংস্র নিশাচর প্রাণীদের মতো জ্বলছে,কুচকুচে কালো দাঁড়ি গোঁফের ফাঁক  দিয়ে অসহ্য সাদা-সাদা দাঁতগুলো  বার করে হাঁসছে, আর নিচের দিকে ............
পাগলটাকে ভালো করে দেখতে পেয়ে  পিনুকাকার নিঃস্বাস বন্ধ হয়ে এলো , হৃৎপিন্ডটা যেন গলার কাছে এসে লাফাতে শুরু করেছে ,মাথা ঘুরছে  একহাত বাড়িয়ে কোনোরকমে লাম্পপোস্টটা ধরে  নিজেকে সামলালেন , সিগারেটটা দুই আঙুলে শক্ত করে ধরলেন
পাগলটা এবার হাড়হিম গলায় বলল
"যাঃ  , আজ হাতে সিগারেটটা ছিল বলে  খুব বাঁচান বেঁচে গেলি ,  যা পালা   বাড়ি যা"
বলেই  পাগলটা আস্তে আস্তে পিছু হটতে শুরু করল
পিনুকাকার সমস্ত নেশা ততক্ষনে উড়ে গেছে , আঙুলে সিগারেটের ছেঁকা লাগছে , বুকটা ধড়ফড় করছে , তাও তিনি আরেকবার ভালো করে দেখলেন পাগলটা তখনও তার দিকে তাকিয়ে আছে কিন্তু তার শরীরটা সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে কারণ  পাগলটার  ঘাড়ের ওপরের মাথাটা  ঠিক ১৮০ ডিগ্ৰী ঘোরানো , মাতাল না হয়ে থাকলে  ওই পুকুরপাড়েই ব্যাপারটা তার চোখে পড়ত।  দ্বিতীয়বার  এই অমানুষিক দৃশ্য  দেখেই কাকা দু আঙুলে সিগারেটটা চেপে সোজা দৌড় মারলেন।পিছন থেকে  খি খি করে একটা  পৈশাচিক  হাঁসি শুনতে পেলেও আর পিছন ফিরে তাকাননি ,সোজা বাড়ির দরজায় গিয়ে আছড়ে পড়লেন।

সবাই এতোক্ষণ বেশ মন দিয়ে গল্পটা শুনছিল , সোমনাথ আর থাকতে না পেরে  জিজ্ঞাসা করলো
"তারপর"
"তারপর  আর কি ,  শকের চোটে জ্বর হয়ে গেল ,দিনকতক ভোগার পর যখন সুস্থ হলেন তখন দেখা গেল তিনি আর কিছুতেই একা থাকতে পারেন না "
শ্যাম বলল
"তা পানুকাকা না পিনুকাকা সে শেষমেষ কি করলো ?"
"কি আবার করবে , বাড়ির বড়রা ধরে বিয়ে দিয়ে দিলো ,  কাকিমা মহা জাঁদরেল মহিলা ,ভূতও তাকে ভয় খায় ব্যাস প্রবলেম সল্ভ "
সবাই হেঁসে উঠলো , পিছনের টেবিলেও যেন একটু চাঞ্চল্যের সাড়া পাওয়া গেল। আবির একবার আড়চোখে তাকিয়ে দেখলো ছেলে-মেয়ে দুটো এখনো একইভাবে হাত ধরাধরি করে  বসে আছে আর সব খাবারদাবারগুলো  টেবিলেই পড়ে  আছে
বাব্বা কি প্রেম !!!!!

"এইতো এসে গেছ , উফফ বাঁচালে মাইরি "
সোমনাথের গলা শুনে আবির তাকিয়ে দেখলো ওদের টেবিলে একজন  বেয়ারা কফির কাপগুলো নামিয়ে রাখছে এখনো পকোড়া আর মোগলাইয়ের দেখা নাই ,
রঞ্জন একটু বিরক্তভাবেই জিজ্ঞাসা করল ,
"আর কতক্ষন লাগবে "
বেয়ারা পাশের টেবিলে একটা কোল্ড-কফি নামিয়ে রেখে দিয়ে , মুচকি হেসে চলে যেতে যেতে বলল
"মাত্র দু-মিনিট "
সেইদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হটাৎ আবিরের মনে পড়ল 'মাকসুরদা ', কোনো খাবার পেতে কতক্ষন লাগবে সেটার উত্তরে মাকসুরদা সব সময় বলতো "মাত্র দু মিনিট।" কিন্তু মাকসুরদা যখন কফি হাউসের কাজ ছেড়ে দিলো তখন তো  ওরা  সবে  কলেজে উঠছে , তারপরতো তাকে আর দেখায় যায়নি , এটা কি তবে ওর ভাই বা ছেলেজাতীয়  কেউ?
 নাহ বেশী ভেবে লাভ নেই  ,যে যার মতো কফির কাপ টেনে নিয়েছে , আবিরও একটা কাপ  টেনে নিয়ে চুমুক দিলো।
রঞ্জন পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেটটা বার করে  টেবিলের ওপর রেখে দিল, আবির হাত বাড়িয়ে তুলে নিলো ,
ফিল্টার-ছাড়া চারমিনার , আবির একটা বার করে ঠোঁটে রাখলো,শ্যাম দেশলাইটা এগিয়ে দিলো , আবির একটা টান দিয়ে বলল
"আঃ   ন্যাংটা-চারু!!  কোথায় পেলি ?"
"নিচের দোকানটায় ,  ফেলুদার ব্র্যান্ড গুরু "
আবির হেসে ফেলল আবার
সোমনাথ উঠে একবার জানলা দিয়ে কিছু একটা দেখা আবার ফিরে  এলো , রঞ্জন বলল
"কি দেখছিলিস বাইরে বৃষ্টি পড়ছে কিনা ?"
"হুম , এখনো একটানা পড়ে যাচ্ছে থামবার কোনো   নামগন্ধ  নেই "
"ছাড় তো , আয় বোস  কফি দিয়ে ন্যাংটা-চারু খা "
" সে তো খাবোই কিন্তু শালা খাবারটা আসতে আসতে  কফিটা যে  শেষ হয়ে যাবে "
"কুছ পরোয়া নেহি আরেক রাউন্ড বলে দেবো "
শ্যাম কফিটা শেষ করে কাপটা রাখতে রাখতে আবিরের দিকে তাকিয়ে বলল
"তোর গল্পটা শুনে আমার একটা ঘটনা মনে পড়ে গেল "
আবার একটা গপ্পোর গন্ধ পেয়ে সবাই বেশ নড়েচড়ে বসল
"এটাও ভৌতিক কাহিনী ?"
"নাহলে আর বলছি কেন "
"আহা  ইরশাদ ইরশাদ"
শ্যাম তার গল্প শুরু করলো ,"ঘটনাটা ঘটেছিলো আমার মায়ের ছোটমেসোমশাইয়ের সাথে , তিনি ছিলেন সেযুগের
M L F পাস করা ডাক্তার , আমি আমরা ডাকতাম ডাক্তারদাদু বলে ,তাঁর আসল নাম ছিলো সূর্যশেখর মাইতি,
এই ঘটনাটা আমি নিজে তাঁর  কাছ থেকে শুনেছি , তাই আমি যেভাবে শুনেছি তোদেরও সে ভাবেই  বলছি
............সূর্যশেখর ডাক্তারির পরীক্ষায় পাস করে  নিজের প্র্যাকটিস শুরু করেন আউলপুর গ্রামে , সে সময়ের কথা
তখন এইসব দেশ গ্রামে  একজন পাস্ করা ডাক্তারের অস্তিত্ব কল্পনা করাও অসম্ভব ছিল  , কলকাতা থেকে পাস করে
সূর্যশেখর কেন আউলপুরে গিয়ে চেম্বার খুললেন সেটা একটা  অন্য গল্প। তাঁর নিজের গ্রাম পটাশপুর ছিল বেশ অনেকটাই দূরে , মা -বাবা কোলকাতাতে পড়াকালীনই কলেরায় মারা যান তাই গ্রামের ওপর তাঁর বিশেষ টান ছিলো না। তিনকূলে আর কেউ ছিলোনা বলেই তিনি ঠিক করেছিলেন আর্তের সেবায় জীবন কাটিয়ে দেবেন। আউলপুর গ্রাম ছিল যাকে বলে একেবারে অজ পাড়াগাঁ , পাকা-রাস্তা নেই ইলেট্রিক আলো গ্রামের চারজন বড়োমানুষের ঘরে অব্দি এসে থেমে  গেছে , সামনের বিশ মাইলের মধ্যে কোনো স্বাস্থকেন্দ্র অব্দিও নেই। সূর্যশেখর  এই গ্রামে এসে চিকিৎসা করতে চান শুনে শুধু   সেই গ্রামের নয়  আশেপাশের আরো চার-পাঁচটা  গ্রামের লোকও  খুব খুশি হলো। কলকাতার পাস করা ডাক্তার বলে কথা ,গ্রামের লোকেরা নিজেরাই উদ্যোগ নিয়ে একটা মাটির দোতলা ঘর বানিয়ে দিলো , একতলায় ডাক্তারখানা আর দোতলায় ডাক্তারের থাকার ব্যবস্থা  , দিন কেটে যাচ্ছিলো। সন্ধ্যাবেলায় মাঝে মাঝেই গ্রামের
 কেষ্ট-বিস্টুরা  এসে খোঁজ নিয়ে যেতেন কোনো অসুবিধা হচ্ছে কিনা। সূর্যশেখরের বাবা মারা যাবার আগে তাঁর নামে  মোটা টাকা রেখে গিয়েছিলেন, তাই আর্থিক  কষ্টে তাঁকে কোনোদিনও বিশেষ পড়তে হয়নি,গ্রামের অধিকাংশ লোকই ছিল খুব গরিব ফী দেবার ক্ষমতা তাদের ছিলোনা ,তাই ডাক্তারের নাম প্রচুর হলেও টাকা বিশেষ হয়নি ,অবশ্য
তিনি এসবের ধার ধরতেন না ,খুব কড়া মেজাজের মানুষ ছিলেন তাই রোগীরা যেমন ভয় পেত তেমন শ্রদ্ধাও করত।

                                                                            সূর্যশেখরের আউলপুরে  ডাক্তারি শুরু করার পর প্রায়
আট-নয় মাস কেটে গেছে , একদিন সন্ধ্যেবেলা তিনি একতলায় বসে সেদিনের মতো শেষ রোগীটিকে  দেখছেন , আর গ্রামের একজন দুজন করে কর্তা -ব্যক্তিরা আসতে আসতে জমায়েত হচ্ছেন । ডাক্তারের রোগী দেখা শেষ হলেই দাবার আড্ডা শুরু হবে চলবে অনেকরাত  অব্দি , ডাক্তার নিজে বিশেষ  দাবা না খেললেও আড্ডাটা বেশ উপভোগ করতেন, আর গ্রামের এই বয়োজোষ্ঠ অভিজাত সমাজের অনেকেই এই ডাক্তারটিকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন, কাজেই বয়সের ব্যবধানটা আড্ডায় বাধা হয়ে দাঁড়াতো না। সূর্যশেখর শেষ রোগীটিকে বিদায় করে দিয়ে , নিজের চাকরের উদ্যেশে হাঁক দিলেন
"কালু , চা বানা আর সঙ্গে পাঁপড় ভাজা , সবার জন্য "
"এজ্ঞে  বাবু , বানাইতেসি "
ডাক্তার গিয়ে আড্ডায় মধ্যমনি হয়ে বসলেন , দাবার ছক বসলো , গুটি এগোলো , চা পাঁপড় এলো আড্ডা বেশ  জমে উঠেছে এমন সময় কোথা থেকে কি একটা কথায়  প্রসঙ্গ উঠলো , ভূতের ভয় নিয়ে ,আর ডাক্তার  দুম করে বলে বসলেন তিনি ভূতে বিশ্বাস করেন না। শুনে আড্ডার সবার তো পিলে চমকে যাবার জোগাড় , ছোকরা  বলে কি ???ভূত মানে না ,তার মানে ভগবানও মানে কিনা সন্দেহ , বয়োজোষ্ঠ যাদের মনে মধ্যে  একটি  সুপ্ত বাসনা ছিল  এই যুবক ডাক্তারটিকে নিজের জামাই  বানানোর তাঁরা সে আশা ত্যাগ করার কথা ভাবতে শুরু করলেন। ডাক্তারকে অবশ্য  কেউই সোজাসুজি চটাতে সাহস করলেন না ,শুধু বাড়ি ফেরার আগে বৃদ্ধ মানস চক্রবর্তী বলে গেলেন ,
"দেখো বাবা , তুমি আমার নাতির বয়সী , তাই এই বুড়ো দাদুর একটা কথা রাখবে ?"
এখন সূর্যশেখর মানসবাবুকে  খুবই সম্মান করতেন , কেননা যে জমিতে ওঁর এই চেম্বার ,বাড়ি সেটা এই আসলে বৃদ্ধের, ডাক্তারকে প্রথম দেখে তাঁর এতো ভালো লেগে গিয়েছিলো যে নিজে থেকে তিনি উদ্যোগ নিয়ে ডাক্তারকে এখানে বসত করিয়েছেন, তাঁর কোনো কথা অমান্য করেন কি করে
ডাক্তার বললেন
"নিঃসঙ্কোচে বলুন "
"শোনো তোমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস তোমার কাছে।মানতে ইচ্ছা হয় মেনো ,না হলে নয় , তবে বাবা একটা কথা বলি ,যদি মাঝরাতের দিকে অচেনা লোকের কাছ থেকে খুব দূরের  কোনো কল আসে তাহলে বাবা চেষ্টা করো রাতে না  যেতে , আর একন্তই যদি যেতে হয় তাহলে ভোরের আলো ফোটার পর যেও "
ডাক্তার প্রতিবাদ করলেন
"সেকি , আমি যে ডাক্তার রোগীর অবস্থা খারাপ  শুনলে না গিয়ে থাকি কি করে  বলুন তো "
মানসবাবু ,একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন ,
"জানতাম  শুনবে না ,তুমি বড্ডো জেদি বাবা , ......আচ্ছা শোনো  তোমার বাড়ির পশ্চিমের দিকে ইদ্রিস গাড়োয়ানের  বাড়ি , চেনো ওকে ?"
"বিলক্ষণ চিনি  "
"হুঁ , ও আমার খাস প্রজা , আমি ওকে বলে রাখবো , যদি যাও তাহলে ওকে নিয়ে ওর গাড়িতে যেয়ো কেমন , আর আপত্তি করোনা"
"আচ্ছা বেশ তাই সই "
"বেঁচে থাকো বাবা বেঁচে থাকো , চলি আজকে "
ডাক্তার দরজা বন্ধ করে হেসে ফেললেন কোন যুগে যে বাস করছে এরা।
এই ঘটনার পর আরো চার পাঁচ মাস কেটে গেছে , মাঝে একবার রাতের কল এসেছিলো দূরগ্রাম থেকে তবে সেখানের জমিদারের ছেলে অসুস্থ ছিল বলে জমিদার ঘোড়ার গাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।
সেইদিন ভোরবেলা থেকেই ঝড় শুরু হয়েছিল , কালু আগেরদিন গিয়েছিলো শহরে কয়েকটা দরকারি জিনিস কিনে আনতে আর ফিরতে পারেনি , সূর্যশেখরের দুদিন আগে রোগী দেখতে গিয়ে কাদায় পড়ে পা মচকে গেছে , সকাল থেকেই ঝড় বৃষ্টি চলছে দেখে বুঝলেন আজকে আর কেউ আসবেনা , কোনোরকমে নিজেনিজেই দুটি  ভাতে-ভাত   ফুটিয়ে
নিলেন ,দুপুরের দিকে ঝড়টা বন্ধ হলেও বৃষ্টি পড়েই যাচ্ছিল।  সন্ধ্যার দিকে  বুঝলেন হাল্কা জ্বরজ্বর মতো লাগছে
তাই একটু ব্র্যান্ডি খেয়ে নিয়ে , আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়লেন , বাইরে থেকে তখনও  বৃষ্টি পড়ার টুপটাপ শব্দ ভেসে আসছে সেটা শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে গেলেন। ঘুমটা ভাঙলো একটা শব্দে , নিচের ডাক্তারখানার দরজাটাই সদর দরজা , আর সেটাতে কে যেন জোরেজোরে ধাক্কা দিচ্ছে আর চিৎকার করছে
"ডাক্তারবাবু  ও ডাক্তারবাবু দরজাটা খুলুন। ........"
সূর্যশেখর বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লেন , একটা হ্যারিকেন হাতে নিয়ে দোতলার জানলার কাছে গিয়ে নিচে তাকালেন ,
এতক্ষনে বাইরে বৃষ্টি থেমে গিয়ে মেঘ পরিষ্কার হয়ে গিয়ে দিব্বি চাঁদ উঠেছে , সেই চাঁদের আলোয় দেখলেন ধপধপে
ধুতি পাঞ্জাবি পরা একজন ভদ্রলোক দরজার ধাক্কা দিচ্ছেন
" দাঁড়ান আসছি " বলে তিনি খোঁড়াতে খোঁড়াতে একতলায় নেমে দরজা খুললেন ,দরজা খুলে দিতেই ভদ্রলোক ঘরে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ে বললেন
"ডাক্তারবাবু শিগরির চলুন , আমার একমাত্র শ্যালক খুব অসুস্থ "
"আগে দরজাটা বন্ধ করে এসে বসুন , তারপর সব খুলে বলুন কি হয়েছে ,"
 ডাক্তার এসে নিজের চেয়ারটায় বসে টেবিলের ওপর হ্যারিকেনটা রাখলেন , অন্যদিন কালু দুটো হ্যাজাক জ্বেলে দিয়ে যায় , কিন্তু আজকে এই হারিকেনই ভরসা , দেরাজে অবশ্য দুটো মোটামোটা মোমবাতি আছে দরকার পড়লে জ্বালা যাবেখন।
ভদ্রলোক দরজাটা লাগিয়ে এসে চেয়ারে বসলেন
"আপনি  আসছেন কথা থেকে "
"বেলডাঙা থেকে "
"বেলডাঙা!!! সেতো অনেকদূরে , এই ঝড় বৃষ্টিতে এলেন কি করে !!!"
"আমার একটা সাইকেল আছে বৃষ্টি থামার পর  তাতেই চড়ে এসেছি , আপনি একটি বার চলুন ডাক্তার বাবু  আমার শ্যালক.....
"কি হয়েছে তার?"
"ঠিক বুঝতে পারছিনা আজ দুপুর থেকেই ধুম জ্বর ,একদম বেহুঁশ , সারা গা যেন আগুনের মতো তেতে আছে"
"হুমম। .. পরীক্ষা না করে তো বলা মুশকিল কি সমস্যা হয়েছে ?আপনি যা বর্ণনা দিলেন তাতে পৃথিবীর পঞ্চাশ শতাংশ অসুখ এর মধ্যে পড়ে "
"তাই তো বলছি আপনি দয়া করে একটিবার চলুন আমার সাথে , আমার স্ত্রীর একমাত্র ভাই ,আমার স্ত্রী খুব দুশ্চিন্তা করছেন ,হয়তো আমার দেরী দেখে .....
আবার দরজার ওপর দুমদুম করে শব্দ হল , ডাক্তারবাবু উঠতে যাবেন এমন সময় ভদ্রলোক বললেন
"দাঁড়ান আমি দেখছি " বলে উঠে  গেলেন।
ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে সূর্যশেখরের কেমন যেন একটা খটকা লাগছিলো ,এবার তাঁর দরজা খুলতে যাওয়া দেখে খেয়াল হলো আশ্চর্য তো !!বাইরে এতো ঝড় বৃষ্টি হলো অথচ ওনার গা তো দিব্যি খটখটে শুকনো ,উনি বলছেন উনি বৃষ্টি থামার পর বেরিয়েছেন সেক্ষেত্রে রাস্তাঘাটে এখন প্রচুর কাদা কিন্তু ওনার গায়ে তো  কাদার ছিটে ফোঁটাও নেই , সাইকেলে এলেও   কাপড়ে কাদা লাগবেই ,  ডাক্তারের চোখ ভুল হবার তো  কথা নয় , অজান্তেই তাঁর   চোয়ালটা  শক্ত হয়ে গেল , লোকটা আবার কোনো সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে আসছে নাকি?মতলবটা কি? ডাক্তার দেরাজ থেকে মোমবাতিটা বার টেবিলে রাখতে রাখতে দেখলেন ভদ্রলোক এবার একজন সুন্দরী মহিলাকে নিয়ে আসছে , মহিলাটি মুখ অর্ধেক ঘোমটায় ঢাকা , দেখলেই বোঝা যায় বেশ সমভ্রান্ত পরিবারের কেউ , এবং এনার পায়ে কালো মতো যেন কি একটা লেগে আছে তিনি এসে ডাক্তারকে দেখেই কাঁদো কাঁদো গলায় বললেন
"ডাক্তারবাবু আপনি  চলুন, আমার ভাই খুব অসুস্থ , গা পুড়ে যাচ্ছে আপনি আপনি ........"
ভদ্রমহিলা কেঁদে ফেললেন , ওনার স্বামী স্বান্তনা দিতে দিতে  বললেন
"আমার  স্ত্রীর এই ভাই ছাড়া বাপের বাড়ির কেউ নেই, তাই উনি ........"
ডাক্তার বাধা দিয়ে বললেন
"ঠিক আপনি  শান্ত হন আগে আমি আছি তো "
ভদ্রমহিলা ফুঁপিয়ে চললেন ,ডাক্তার দেরাজ থেকে আর একটা মোমবাতি বার করে দুটো মোমবাতি একসঙ্গে জ্বালিয়ে দিলেন , ভদ্রমহিলা সঙ্গে সঙ্গে
"ওমাগো  ওটা কি !!!" বলে চিৎকার করে এমন জোরে হাত পা ছুঁড়লেন তাতে একটা মোমবাতি নিচে পড়ে গেল , ডাক্তারও  ঘটনার আকস্মিকতায় চমকে উঠেছিলেন, তারপর বুঝলেন বিষয়টা কি , আসলে দুটো মোমবাতি জ্বালার ফলে ঘরের কোনে রাখা কঙ্কালটা ভদ্রমহিলার চোখে পড়তেই উনি ভয় পেয়েএই কান্ডটি ঘটিয়েছেন  ,ডাক্তার সেটা বুঝতে পেরে হেসে বললেন
"ওটা  আমার ছাত্রজীবনের সঙ্গী ওটাকে অত ভয় পাবার কিছু নেই "
বলতে বলতে ডাক্তার নিচে ঝুঁকে পড়ে  মোমবাতিটা তুলতে গেলেন , মোমবাতিটা টেবলের নিচে পড়ে গেলেও নিভে যায়নি জ্বলছিল , সেই আলোতে তিনি দেখলেন ভদ্রমহিলার শাড়িটি পায়ের গোড়ালির একটু উপরে উঠে আছে ,বাকি পায়ের অনাবৃত অংশে যেটাকে  তিনি শুকনো কাদা বলে ভাবছিলেন পরিষ্কার দেখতে পেলেন সেটা কাদা নয় , কালো কালো লোমে পায়ের পাতাটা ভর্তি  বোধহয় গোটা পাটাই তাই , আর পায়ের আঙুলের নখগুলো  বাঁকানো এবং তীক্ষ্ণ , ডাক্তার পরিষ্কার বুঝতে পারলেন এটা আর যাই হোক  কোনোমতেই একজন  মানুষের পা নয়, ডাক্তারের হাড় কেঁপে উঠলো , কিন্তু মাথা তিনি ঠান্ডা রাখলেন,এসব সময় ভয় পেলে চলেনা।
 তারপর  মোমবাতিটা তুলে চেয়ারে সোজা হয়ে বসলেন
স্বামী -স্ত্রী দুজনেই ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে আছে নিস্পলক চোখে , শেষমেষ মহিলাই বললেন
"ডাক্তারবাবু আপনি  চলুন "
ডাক্তার অসম্ভব গম্ভীর গলায় বললেন
"আমি যাব কি করে বলুন তো ? দেখছেন তো পায়ের এই হাল  কোনোরকমে এঘর ওঘর করছি মাত্র "
"সেটা কোনো ব্যাপার নয় আমি সাইকেল এনেছি তাতে করে আপনাকে নিয়ে যাবো "
"আর আপনার স্ত্রী ?"
"ও আপনি ভাববেন না ডাক্তারবাবু আমি হেঁটে চলে যাবো "
"নাহ সেটা হতে পারেনা , আর তাছাড়া আমার যা অবস্থা তাতে  সাইকেলে চেপে  যাওয়াও সম্ভব নয়।
দম্পতি চুপ করে গেল তারা একে ওপরের দিকে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করছে
ডাক্তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাদের দিকে তাকিয়ে ছিলেন , এবার বললেন
"আমি বলি কি , আমার বাড়ির পশ্চিমপাশে ইদ্রিস গাড়োয়ানের বাড়ি , ওর সাথে আমার ব্যবস্থা করা আছে আপনারা ওকে গিয়ে আমার নাম করে বলুন, ও দশ মিনিটের মধ্যে গাড়ি তৈরী করে দেবে , তাতে করে আমি আপনার স্ত্রী দুজনেই যেতে পারবো কি বলেন ?"
ভদ্রলোক একটু কিন্তু কিন্তু করছিলেন , ওনার স্ত্রী চেয়ার ছেড়ে উঠে  দাঁড়িয়ে ঠান্ডা স্বরে বললেন
"গাড়ি না হলে আপনি যাবেন না তাই তো , ঠিক আছে আমরা গাড়ি নিয়ে আসছি এরপর কিন্তু আর  কোনো  অজুহাত শুনব না।  চলো "
বলেই দুজনে বেরিয়ে গেলেন ডাক্তার এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো সে দিকে কয়েক মুহূর্ত  , ওরা দুজনে রাস্তায় নামামাত্রই   ডাক্তার দৌড়ে এসে দরজাটায় খিল তুলে দিলেন , ডাক্তারের সারা শরীর থরথর  করে কাঁপছিলো, আস্তে আস্তে দরজায় পিঠ দিয়ে তিনি মাটিতে বসে পড়লেন , বুকের ভেতর হাতুড়ি পেটের মতো শব্দ হচ্ছে। দরজাটা বন্ধ করার শব্দটা বেশ  জোরেই হয়েছিল।কারণ ডাক্তার মেঝেতে বসে পড়া মাত্রই দরজায় আবার ধাক্কা শুরু হয়
"ডাক্তারবাবু ও ডাক্তারবাবু  দরজাটা খুলুন না। ..............
ওই ডাক্তার খোল খোল বলছি , কি ভাবছিস  দরজা লাগিয়ে বেঁচে যাবি "
ডাক্তার দুহাত দিয়ে নিজের কান চেপে ধরলো , দরজার প্রতি আঘাতের সাথে গোটা বাড়ি যেন কেঁপে কেঁপে উঠছিলো , সাথে চিৎকার কখনো দরজার সামনে, কখনো বাড়ির পিছনে, সারা বাড়ি ঘুরতে ঘুরতে দুজনে চিৎকার করে যাচ্ছিলো "ডাক্তার দরজা খোল "
কখনো অনুনয় কখনো হুমকি কখনো বা হিংস্র জীবের অপার্থিব হুঙ্কার  কখনো দরজায় ভারী কিছুর আঁচড়ের শব্দ ,সেটা যে কি তা ডাক্তারের আর সাহস হয়নি দোতলায় গিয়ে দেখার  , ডাক্তার দরজার সামনে চুপচাপ হাঁটুতে মুখ গুঁজে বসে রইলো আর সারা রাত সেই ধাক্কা আর চিৎকার সমানে চলে গেল , ডাক্তার একটাও জবাব দেয়নি , চুপচাপ বসে থেকেছে। ভোর হবার পর দরজায় ধাক্কা পড়াটা বন্ধ হলো কিন্তু শাসানি থামলো না ,কিন্তু ডাক্তার ওই ভাবেই ঠায় বসে রইলো। তরপর সকালবেলায় ................


শ্যামের ঠিক মতো গল্প শেষ হবার আগেই  মনোজদা চারটে কফি নিয়ে হাজির হলো , টেবিলে  রাখতে রাখতে বললো
"সরি গো একটু দেরি হয়ে গেল "
শ্যাম  বলল
"আহা মনটা বড় কফি কফি করছিলো গো , কিন্তু বাকি খাবার কই "
মনোজদা একটু অবাক হলো
"বাকি খাবার ! তুমি তো তখন ঢোকার সময়ে আমাকে  বলে এলে চারটে  কফি, আমি তো সেটাই নিয়ে এলাম "
আরে তোমাকে নয় গো আর একজনকে বলেছিলাম সে এখনো নিয়ে এলোনা  তুমি একটু দেখোনা "
" হ্যাঁ  অবশ্যই  দেখছি "
মনোজদা তক্ষুনি চলেই  যাচ্ছিলো আবির ডাকলো


"আচ্ছা মনোজদা তোমার মাকসুরদাকে মনে আছে ?"
"হ্যাঁ কোনো থাকবেনা ,ঐতো  তোমরা যেবারে ইস্কুল থেকে পাস্ করলে সে বছরই তো ...
"নিখোঁজ হয়ে যাই জানি , কিন্তু তার কি কোনো ছেলে বা ভাই কেউ এখানে কাজ করে ?"
"কোই নাতো , আর করলে তোমরা জানতে পারতে না ? তা ছাড়া মাকসুরের তিনকূলে কেউ ছিল বলে তো আমি জানিনা "
"হুম সেটাই "
সোমনাথ বললো
"ছাড়ো তো  তুমি একটু খাবার গুলো দেখো "
মনোজদা একটু ব্যাস্ত হয়েই নিচে নেমে গেল , রঞ্জন শ্যামকে বললো
"হ্যাঁ রে তোর ওই ডাক্তার দাদু জীবিত "
"নাহ  দু বছর আগে মারা গেছেন  কেন রে ?"
"এমনি, আচ্ছা উনি কিসের পাল্লায় পড়েছিলেন সেটা কি উনি বুঝেছিলেন ?"
"বোধহয় , warewolf জাতীয় কিছু হবে হয়তো,এতদিন পরে সেটা  ............
মনোজদা হন্তদন্ত হয়ে উপরে উঠে এলো হাতে একটা বিল
সেটা এগিয়ে দিয়ে বললো
"এটাই  কি তোমাদের বিল"
আবির হাত বাড়িয়ে বিলটা নিয়ে পড়তে শুরু করলো
"ছয় কাপ কফি ,একটা চিজ স্যান্ডুউইচ ,একটা মটন কবিরাজি ,একটা কোল্ড ...  ..   নাহ  আমরা তো শুধু কফি
 আরে , এটা তো
আবির পাশের টেবিলের দিকে তাকাতে গিয়ে পুরো থ হয়ে গেল ,টেবিলটা  ফাঁকা শুধু কোল্ড কফির গ্লাসটা পড়ে  আছে।
অন্যরাও সেটা দেখে চুপ করে গেল  , ছেলেমেয়ে দুটো কখন উঠে গেল ??এইতো শ্যামের গল্প চলছিল যখন তখনও ওদেরকে দেখা গেছে সেই একইভাবে হাত ধরাধরি করে বসে আছে, আর যদি ওরা উঠেও  যায় তাহলেও সেটা তো সেটা ওদের টেবিল  পেরিয়েই যেতে হবে,চারজনে মুখ চাওয়াচায়ি করলো
মনোজদা বয়স্ক মানুষ হয়তো বিষয়তা বুঝতে পেরেই ,খুব গম্বীরভাবে বললো
" আজকে সন্ধ্যেবেলায় তোমরা ছাড়া এইদিকে আর কেউ আসেনি, এই বিলটা তাহলে ............ "
কেউ কোনো উত্তর দিতে পারলো না ,
পাশের টেবিলে কোল্ড কফির গ্লাসটা তখনো পড়ে আছে।








বাইরে দোকানের শেডের তলায় সুগত আর দিতি দাঁড়িয়ে ছিলো , সুগত আস্তে করে জিজ্ঞাসা করলো
"এবার কোথায় যাবে"
 দিতি সুগতর কাঁধে মাথা রাখতে রাখতে বললো
"রবীন্দ্র সরোবর ",
সুগত  হাসলো,বৃষ্টির জলের ছাট ওদেরকে ঠিক স্পর্শ করতে পারছিলো না ,জলের কোন গুলো কেমন যেন পিছলে পিছলে যাচ্ছিলো। .........