প্রতিবিম্ব
দিতি আর সুগত মুখোমুখি বসেছিলো ,কফিহাউসের দোতলার বারান্দার একদম কোনের শেষের টেবিলটায় ,সুগত নিজের ট্যাবটা খুলে কিছু একটা দেখছিলো আর দিতি অলস আঙুলে চামচ জড়িয়ে কফির কাপে চিনি মেশাচ্ছিলো , সুগত লাস্ট দশ মিনিট ধরে ট্যাব খুলে কিছু একটা হিসাব করে যাচ্ছে আর সেটা মেলানোর জন্যই বোধহয় বারবার ঘড়ি দেখছে। দিতি খুব ভালো করে জানে যে এই সময় সুগতকে কিছু জিজ্ঞাসা করাটা বেকার তাই কফির কাপ থেকে চামচটা তুলে প্লেটে ওপর রাখলো, টুং করে একটা শব্দ হল।এবার সুগত নিজের ট্যাবটা টেবিলে রেখে একপলক দিতির দিকে তাকালো তারপর পিছন দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে বলল "মাকসুরদা এক প্লেট চিজ স্যান্ডুইচ আর একটা মটন কবিরাজি, একটু জলদি কর "
দূরে মাকসুরদা হাত নেড়ে জানাল হয়ে যাবে। দিতি হেসে ফেললো , মটন কবিরাজী আর চিজ স্যান্ডুইচ দুটোই ওর খুব প্রিয় , নাহ এবারও সুগতর ওপর রাগ করে থাকা গেল না, দিতি বলল
"কি দেখছিলে এতক্ষন ?"
"একটা আর্টিকেল পড়ছিলাম , কলকাতার দশটি ভুতুড়ে জায়গা।ন্যাশনাল লাইব্রেরী , আকাশবাণী ভবন ,রবীন্দ্রসরোবর মেট্রো........."
"তাই , তা সেই লিস্টে কি কফি হাউস আছে?"
" নাহ এই লিস্টে তো দেখছিনা ,অন্য কোথাও থাকলেও থাকতে পারে ,এতদিনের পুরানো বাড়ি ভুতুড়ে হতেই পারে "
"হলে কিন্তু মন্দ হয়না বলো "
"হুঁ.....তা হয়না। ......
সুগত আবার নিজের ঘড়িটা দেখলো , দিতির ভ্রুটা কুঁচকে গেল , ব্যাপারটা কি !
" আজ এতো ঘনঘন ঘড়ি দেখছো কেন? অন্য কোথাও যাবার আছে বুঝি ?"
সুগত এবার হেসে ফেললো তারপর টেবিল থেকে কাপদুটো একটু সরিয়ে ,নিজের হাতদুটো বাড়িয়ে দিতির একটা হাত নিজের মধ্যে নিল,দিতির গালে চট করে একটা হাল্কা বেগুনি রং খেলে গেল। নিজের দুই কনুই টেবিলের ওপর ঠেকিয়ে দিতির চোখে চোখ রেখে সুগত বলল ,
" একটা মজা দেখবে ?"
দিতি এবার চোখদুটো বড়োবড়ো করে চশমার ওপর দিয়ে তাকালো ,সুগতর এই ভঙ্গিটা ওর খুব চেনা , সন্ধ্যেবেলা এই সময় অন্যদিন কফি হাউস গম গম করে কিন্তু আজকে সেই দুপুর থেকে টানা বৃষ্টি পড়ে চলেছে তাই নিচের তলায় ভিড় থাকলেও ওপরের বারান্দার এই দিকটা একদম ফাঁকা। এক সেকেন্ডের জন্য দিতির ইচ্ছা হল সুগতর হাত থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে দৌড়ে পালিয়ে যায় , কিন্তু সেটা ভাবতেই ও হেসে ফেলল ,ধুৎ সুগতর পাল্লায় পড়ে দিনকে দিন ওর মাথাটা যাচ্ছে। মাকসুরদা এসে চিজ স্যান্ডুইচ আর মটন কবিরাজির প্লেটদুটো দিয়ে গেল।
সুগত বলল
"থ্যাংকু মাকসুরদা , একদম ঠিক সময়ে এসেছো , খুব খিদে পেয়েছিলো গো , আর শোনোনা শেষে একটা কোল্ড কফি দিয়ে যেও কেমন "
মাকসুরদা এই জোড়টিকে বিলক্ষণ চেনে তাই ঘাড় নেড়ে হ্যাঁ বলে মুচকি হেসে চলে গেল। মাকসুরদার চলে যাবার দিকে তাকাতেই দিতি দেখতে পেল , একজন এই দিকেই আসছে ,বোধহয় পাশের টেবিলটাতেই বসবে , একা আছে? না পিছনে আরো একজনকে দেখা যাচ্ছে। দিতি ঘাড় সোজা করে সুগতর মুখে চোখ রাখলো , সুগতর চোখদুটো যেন জ্বলজ্বল করছে উত্তেজনায় ,দিতি এবার সুগতর হাতদুটো শক্ত করে আঁকড়ে ধরলো। পাশে চেয়ার টানার শব্দ হল, দিতি সুগতর মুখ থেকে আর চোখ ফেরালো না ।
সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে আবির প্রথমে একটু অবাকই হল , এই দিকের বারান্দাটা প্রায় রোজকার মতো খালি বললেই চলে ,কিন্তু একদম শেষের টেবিলটায় বসে একজোড়া ছেলেমেয়ে প্রেম করছে , আবির ওদের দিকেই এগিয়ে গেল। বেয়ারা ওদের খাবারগুলো দিয়ে আবিরের পাশ দিয়ে মুচকি হেসে চলে গেল, হাসিটা কেমন যেন একটু চেনা চেনা লাগলো ,পিছনে ফিরে বেয়ারাটাকে ভালো করে দেখতে গিয়ে দেখলো সোমনাথ কখন উপরে উঠে এসেছে আবিরকে দেখতে পেয়ে ,হাত নেড়ে ওর দিকে এগিয়ে আসতে লাগলো।
" সেই কখন থেকে বৃষ্টি নেমেছে শালা থামার কোনো নাম নেই , ভিজে পুরো কাক হয়ে গেলাম মাইরি"
"বাকিরা কোথায়?"
" রঞ্জন আর শ্যাম সিগারেট কিনে আসছে , তুই কতক্ষণ"
"এই কিছুক্ষন , আয় বসি "
সোমনাথ আর আবির চেয়ার টেনে বসলো। সোমনাথের গায়ের পাঞ্জাবীটা একদম ভিজে গেছে ,কাঁধের ঝোলাটাও ভিজেছে ভালো মতোই , বইপাগল সোমনাথ ঝোলা থেকে দুটো বই বার করে টেবিলের ওপর রাখলো। আবির একটা বই হাতে নিয়ে ওল্টাতে লাগলো , পুরানো বই একটু ভিজেও গেছে , শিবরাম চক্রবর্তীর গল্প সংকলন। সোমনাথ রুমাল দিয়ে নিজের মাথা মুছছিলো , এবার চশমার কাঁচটা মুছতে মুছতে খুব করুন ভাবে বলল
"ভাই একটা কফি বল আগে নাহলে সর্দি হয়ে মারা পড়বো আবার"
আবির ওর কথা বলার ধরনে , হেসে ফেললো ,
"আরে বলছি বলছি "
হাত তুলে বেয়ারাকে ডাকতে গিয়ে দেখে কাছাকাছি কেউ নেই , ওপরতলাটা একদমই ফাঁকা সব বোধহয় নিচে পালিয়ে গেছে , আবির চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল
"কাউকে তো দেখছিনা রে ভাই দাঁড়া আমি বরং নিচে গিয়ে বলে দিয়ে আসছি। "
"তাহলে ছাড় বাদ দে , ওরা আসুক তারপর নাহয় একসাথে অর্ডার করা যাবে , তুই ততক্ষন একটা সিগারেট দে তো "
আবির বসে পড়ল , সোমনাথকে একটা সিগারেট দিয়ে নিজেও একটা ধরালো। বুদ্ধির গোড়ায় ধোঁয়া দিতে দিতে
পাশের টেবিলটায় চোখ গেল , ছেলেটা আর মেয়েটা টেবিলের ওপর দিয়ে হাত ধরাধরি করে বসে একে অন্যের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ,সামনে প্লেট ভর্তি খাবার ,কফির কাপ থেকে ধোঁয়া উড়ছে দুজনের কারুর তাতে কোনো হুঁশ নেই , দুজনকে দেখে তো কলেজে পড়ে বলেই মনে হচ্ছে , অবশ্য ওই বয়সটাই এমন কোনো কিছুর হুঁশ থাকেনা। আবির নিজেও কি কিছু কম করেছে নাকি কলেজ জীবনে , পুরানো সেসব কথা মনে আসতেই ঠোঁটের কোনে একটা হালকা হাসি খেলে গেলো। ওরা চারজন বন্ধু , আবির ,সোমনাথ ,রঞ্জন আর শ্যামলাল , হেয়ার স্কুলের চার বিখ্যাত বিচ্ছু , সেই ক্লাস ইলেভেন থেকে কফি হাউসেই ওদের আড্ডা-অবস্থান ,পরে কলেজ আলাদা হয়ে গেলেও বন্ধুত্বে টান বিশেষ পড়েনি , এখন সবাই যে যার কাজ ,জীবন এসব নিয়ে ভীষণ ব্যাস্ত কিন্তু তাও নিয়ম করে মাসে অন্তত
দু-তিনবার ওরা কফি হাউসে আসবেই আড্ডা দিতে।
"কিরে শালা টান্টু মেরে এসেছিস নাকি? উঠমুখো হয়ে কি ভাবছিস ? আঙুলে যেএবার ছেঁকা লাগবে "
সোমনাথের কথায় হুঁশ হলো আবিরের , সত্যিই তো সিগারেটটা পুড়তে পুড়তে অনেকটাই নেমে এসেছে , তাড়াতাড়ি সেটাকে অ্যাশট্র্যেতে সমাধি দিতে দিতে দেখলো শ্যাম আর রঞ্জন এসে গেছে ,হাত তুলে ওদের ডাকলো
"এই যে এই দিকে "
ওরা তাড়াতাড়ি করে এসে চেয়ার টেনে বসলো
রঞ্জন বলল
"কিরে কুমড়ো কেমন আছিস , আরো ফুলেছিস মনে হচ্ছে "
সোমনাথ বইয়ের পাতা ওল্টাচ্ছিলো , বইটা টেবিলে নামিয়ে রেখে গম্ভীরভাবে বললো
"এই যে আমাকে ক্রমবর্ধমান কুমড়ো বললি , এই জন্য আজ তুই একটা কফি বেশি খাওয়াবি "
সবাই হেসে উঠলো ,রঞ্জন আর সোমনাথের এই খুনসুটিটা সবাই খুব মজা পায় , এমন কি ওরা দুজনও পায়।
শ্যাম বলল
"কি বই রে ওটা একটু দেখি ?"
"শিব্রাম চকোত্তির গপ্পো "
সোমনাথ বইটা এগিয়ে দিতে দিতে বলল
"জানিস শিব্রামের একটা গপ্পো আছে 'গোলদীঘির ভূত' , সেটাতে এই.......
রঞ্জন বাধা দিয়ে বলল
"গোলদীঘি মানে আমাদের কলেজ স্কোয়ার ?"
"হ্যাঁ তাতে এই কফি হাউসের কথা আছে ,এখানেই লেখক একটা আইসক্রিম-খেকো। ....
এবার বাধা দিয়ে আবির বলল
"পড়েছি ভাই গপ্পোটা , সত্যি বলতে কি খুব একটা জমেনি ,কেমন যেন বিলিতি বিলিতি গন্ধ ছিল "
দু -দুবার বাধা পেয়ে সোমনাথ রেগে গিয়ে বলল
"দূর শালা গন্ধগোকুল গন্ধ পেয়ে পেয়েই গেল , এই জন্যেই বাঙালি জাতটার কিস্যু হল না "
শ্যাম বইটা টেবিলে রেখে সোমনাথের পিঠে একটা চাপড় মেরে বলল
"রাগিস না ভাই , নিচে মনোজদাকে বলে এসেছি এই ওপরে এলো বলে , এখন ভূত -ভবিষৎ ছেড়ে বল তো কে কি খাবি।"
শ্যামের কথায় সবারই খাবারের কথাটা মনে ফিরে এলো , শনিবার হাফ ডে , সবাই কাজ থেকেই সোজা এসেছে জোর ক্ষিদে সবারই পেয়েছে।
আবির ক্ষিদে থেকে মন ঘোরানোর জন্য বললো " আজকে শনিবার তারওপর ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়ছে , এমন সন্ধ্যায় ভূতের গল্প ছাড়া আর কি জমে বল। "
রঞ্জন এতক্ষণ মুখ তুলে পিছনের টেবিলের ছেলে মেয়ে দুটিকে দেখছিলো , এবার আবিরের দিকে ফিরে চোখ মেরে বললো
"প্রেম-লীলা "
সবাই ফের হেসে ফেললো
শুধু শ্যাম বললো
" এই আস্তে , ওরা শুনতে পাবে"
"তাতে আমার বয়েই গেছে "
সোমনাথ আবিরকে বলল
"বাছাধন ভূতের গপ্পোর ধুয়ো যখন তুমি তুলেছো তখন তুমিই জম্পেশ করে একখানা সত্যি ভূতের গপ্পো শোনাও তো দেখি "
আবির হালকা হেঁসে বললো "সত্যি কি মিথ্যে জানি না , তবে হ্যাঁ দিন কতক আগে আমার কলেজের এক পুরানো বন্ধুর সাথে দেখা হয়েছিল হাওড়া স্টেশনে , তার বাড়িও হাওড়াতেই ,প্রায় ৩বছর পর দেখা তো ,ব্যাস পাকড়াও করে সোজা বাড়িতে নিয়ে গেল ,তো সে একথা সেকথায় একটা গল্প শুনিয়েছিল সেটাই বলছি , আগেই বলছি গল্পটা আমার শোনা আর ঘটনাটা ঘটেছিলো,আমার বন্ধুটির সেজকাকার সাথে। ........"
বেয়ারা এতক্ষনে এসেছে মনোজদা নয় অন্য একজন , সে এসে জল ভর্তি গ্লাসগুলো রাখতে রাখতেই ওরা অর্ডারটা দিয়ে দিলো
চারটে কফি , দু প্লেট পকোড়া , চারটে মোগলাই পরোটা।
সোমনাথ বলল
"নে ভাই বল। "
আবির আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে শুরু করলো
ঘটনাটা ঘটেছিল আমার বন্ধু গুপির সেজকাকা পিনাকী বিশ্বাসের সাথে ,তা সে অনেকদিন আগের কথা তখন নকশাল আমল একদম শেষের দিকে ,আর ওদের বাড়িটা হাওড়ার যে জায়গাটায় সেখানে ফি সপ্তাহে একটা লাশ পাওয়া খুব স্বাভাবিক বিষয় ছিল। পিনুকাকা কন্ট্রাক্টরির কাজ করতো , বাড়ি ফেরার সময়ের কোনো ঠিক ঠিকানা থাকতো না , তখনও বিয়ে-সাদি করেনি কাজেই প্রায়শই মাঝ রাত হয়ে যেত বাড়ি ফিরতে। গুপিদের বাড়িটা গলির ভিতরে , বড়ো রাস্তা থেকে হেঁটে মিনিট সাত-আট লাগতো। বাড়িতে ব্যবস্থা করাই ছিল , নিচের ঘরে দরজার পাশে একজন বুড়ো চাকর ঘুমাতো মাঝরাতে এসে দরজায় ধাক্কা দিলে সে খুলে দিতো। তো তখন কাকার শ্যামপুরের দিকে একটা কাজ চলছিল , সেদিন ঢালাইয়ের দিন ছিলো , ঢালাইয়ের কাজ ঠিক ভাবে হবার পর সবাইকে মাংস খাওয়ানোর রীতি আছে , কাকা নিজে দাঁড়িয়ে থেকে সবাইকে খাওয়ালেন , তারপর মজুররা দিশি আর বাবুরা সবাই বিলিতির বোতল নিয়ে বসল। এইসব করে সবকিছু মিটিয়ে কাকা যখন গলির মোড়ে গাড়ি থেকে নামলেন তখন রাত পৌনে একটা বাজে , এবার গরমকালে সেটা খুব একটা রাত না হলেও তখনকার সময়ের গুনে রাস্তা পুরো শুনসান। গাড়ির ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে গ্যারাজে চলে গেল। পিনু কাকা গলির পথে পা বাড়ালেন , মদ তিনিও খেয়েছেন , অল্প নেশাও হয়েছে , মদ -মাংসের একটা ঢেকুর তুলে কাকা একটা ৫৫৫ সিগারেট ধরালেন, পা টা একটু টলমল করলেও মাথাটা একদম সাফ আছে , গুন্ গুন্ করে একটা গান গাইতে গাইতে পিনুকাকা হাঁটতে হাঁটতে হিসাব করছিলেন, এবার সামনের বাঁকটা পেরোলেই ভলিবল মাঠ তারপর মেছো পুকুর ,তারপরের মোড়টা পেরোলেই বাড়ির গলি , পাঁচ মিনিটের বেশি লাগা উচিত নয় , ভলিবল মাঠ থেকে বাড়ির গলির আগের মোড়টা অব্দি রাস্তায় আলো নেই ,বাল্বটা বোধহয় আবার চুরি গেছে , কুছ পরোয়া নেই চেনা রাস্তা তাই সিগারেটে টান দিতে দিতে কাকা হনহন করে এগিয়ে যাচ্ছিলেন । মেছো পুকুরের কাছাকাছি পৌঁছে খেয়াল করলেন পুকুরের ঘাটের কাছটায় কুন্ডলী পাকিয়ে কি যেন একটা পড়ে আছে , আবার একটা লাশ নাকি? অন্যদিন হলে কি করতেন কে জেনে কিন্তু আজকে আলকোহলের দয়ায় কাকার সাহসের খামতি নেই তাই সোজা এগিয়ে গেলেন সেদিকে , সামনের মোড়ের মুখের কাছটায় একটা আলো জ্ব্লছে বটে কিন্ত সেটার রেশ পুকুরের ঘাট অব্দি পৌচচ্ছে না। বেশি কাছে যাবার দরকার পড়ল না ,পুকুরের ঘাটের কাছটায় আলো মাখা আবঝা অন্ধকারে পিনুকাকা দেখলেন একটা লোক শুয়ে আছে ঘাড় উল্টে ,পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে না তবে লোকটার বড়ো-বড়ো চুল-দাঁড়ি-গোঁফ আর গায়ের ছেঁড়া জামাকাপড় দেখে পাগল বলেই মনে হচ্ছে তবে ব্যাটা মরেনি দিব্বি নড়াচড়া করছে। পিনুকাকা একটা জোরে নিঃস্বাস ফেলে আবার নিজের বাড়ির দিকে পা বাডাতে যাবেন এমন সময় পাগলটা উঠে বসে বলল
"ওই বাবু একটু আগুনখান দ্যান না , বিড়িটা ধরতাম ",
কি আপদ , পিনুকাকা ঘাড় নেড়ে অতি কষ্টে জড়ানো গলায় বললেন
"আগুন নেই বাওয়া "
"আপনার হাতের সিগারেটখান দ্যান না "
এই কথাটায় কাকার দুম করে রক্ত গরম হয়ে গেল , ব্যাটার সাহস তো কম নয় , একেবারে হাতের সিগারেট চাইছে
"নাহ হবে না " এটা বলেই কাকা আবার হাঁটা লাগালেন। কিন্তু পাগলটা পিছু ছাড়লো না , সে তড়াক করে লাফিয়ে উঠে কাকার পিছু-পিছু চলতে শুরু করলো , আর সাথে সেই ঘ্যানঘ্যানানি
"বাবু একটু আগুনটা দ্যান না , ও বাবু। .....বাবু গো "
এতো আচ্ছা ফ্যাসাদে পড়া গেল , পিনুকাকা কোনো জবাব না দিয়ে আরো জোরে -জোরে হাঁটতে লাগলেন ,পাগলটাও পিছু পিছু যেতে যেতে একনাগাড়ে বলে যেতে লাগলো
"ও বাবু , দ্যান একটু সিগারেটটা আপনার হাত থিকে ,.......ও বাবু দাঁড়ান না। ......আরে ...... ওই বাবু।......
কি হলো কথাটা কানে যাচ্ছেনা নাকি , সিগারেটটা চাইছি তো নাকি , ওই....দাঁড়া বলছি সিগারেটটা দিয়ে যা
নাহলে খুব খারাপ হবে কিন্তু "
অনুরোধ থেকে সোজা হুমকি ,পিনুকাকার এবার গা পিত্তি জ্বলে গেলো , সিগারেটটা শেষ হয়ে এসেছিলো ,সেটা হতভাগাটার গায়ে ছুঁড়ে মারবেন বলে একঝটকায় পিছনে ঘুরে দাঁড়ালেন। পিনুকাকা জোরে জোরে হাঁটার ফলে ততক্ষনে মোড়ের মাথায় চলে এসেছিলেন এবার স্ট্রিট লাইটের আলোয় তলায় দাঁড়িয়ে দেখলেন ,স্ট্রিট লাইটটের আলোর বৃত্তটা যেখান থেকে শুরু হয়েছে পাগলটা ঠিক সেখানে দাঁড়িয়ে আছে , আর চোখদুটো হিংস্র নিশাচর প্রাণীদের মতো জ্বলছে,কুচকুচে কালো দাঁড়ি গোঁফের ফাঁক দিয়ে অসহ্য সাদা-সাদা দাঁতগুলো বার করে হাঁসছে, আর নিচের দিকে ............
পাগলটাকে ভালো করে দেখতে পেয়ে পিনুকাকার নিঃস্বাস বন্ধ হয়ে এলো , হৃৎপিন্ডটা যেন গলার কাছে এসে লাফাতে শুরু করেছে ,মাথা ঘুরছে একহাত বাড়িয়ে কোনোরকমে লাম্পপোস্টটা ধরে নিজেকে সামলালেন , সিগারেটটা দুই আঙুলে শক্ত করে ধরলেন
পাগলটা এবার হাড়হিম গলায় বলল
"যাঃ , আজ হাতে সিগারেটটা ছিল বলে খুব বাঁচান বেঁচে গেলি , যা পালা বাড়ি যা"
বলেই পাগলটা আস্তে আস্তে পিছু হটতে শুরু করল
পিনুকাকার সমস্ত নেশা ততক্ষনে উড়ে গেছে , আঙুলে সিগারেটের ছেঁকা লাগছে , বুকটা ধড়ফড় করছে , তাও তিনি আরেকবার ভালো করে দেখলেন পাগলটা তখনও তার দিকে তাকিয়ে আছে কিন্তু তার শরীরটা সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে কারণ পাগলটার ঘাড়ের ওপরের মাথাটা ঠিক ১৮০ ডিগ্ৰী ঘোরানো , মাতাল না হয়ে থাকলে ওই পুকুরপাড়েই ব্যাপারটা তার চোখে পড়ত। দ্বিতীয়বার এই অমানুষিক দৃশ্য দেখেই কাকা দু আঙুলে সিগারেটটা চেপে সোজা দৌড় মারলেন।পিছন থেকে খি খি করে একটা পৈশাচিক হাঁসি শুনতে পেলেও আর পিছন ফিরে তাকাননি ,সোজা বাড়ির দরজায় গিয়ে আছড়ে পড়লেন।
সবাই এতোক্ষণ বেশ মন দিয়ে গল্পটা শুনছিল , সোমনাথ আর থাকতে না পেরে জিজ্ঞাসা করলো
"তারপর"
"তারপর আর কি , শকের চোটে জ্বর হয়ে গেল ,দিনকতক ভোগার পর যখন সুস্থ হলেন তখন দেখা গেল তিনি আর কিছুতেই একা থাকতে পারেন না "
শ্যাম বলল
"তা পানুকাকা না পিনুকাকা সে শেষমেষ কি করলো ?"
"কি আবার করবে , বাড়ির বড়রা ধরে বিয়ে দিয়ে দিলো , কাকিমা মহা জাঁদরেল মহিলা ,ভূতও তাকে ভয় খায় ব্যাস প্রবলেম সল্ভ "
সবাই হেঁসে উঠলো , পিছনের টেবিলেও যেন একটু চাঞ্চল্যের সাড়া পাওয়া গেল। আবির একবার আড়চোখে তাকিয়ে দেখলো ছেলে-মেয়ে দুটো এখনো একইভাবে হাত ধরাধরি করে বসে আছে আর সব খাবারদাবারগুলো টেবিলেই পড়ে আছে
বাব্বা কি প্রেম !!!!!
"এইতো এসে গেছ , উফফ বাঁচালে মাইরি "
সোমনাথের গলা শুনে আবির তাকিয়ে দেখলো ওদের টেবিলে একজন বেয়ারা কফির কাপগুলো নামিয়ে রাখছে এখনো পকোড়া আর মোগলাইয়ের দেখা নাই ,
রঞ্জন একটু বিরক্তভাবেই জিজ্ঞাসা করল ,
"আর কতক্ষন লাগবে "
বেয়ারা পাশের টেবিলে একটা কোল্ড-কফি নামিয়ে রেখে দিয়ে , মুচকি হেসে চলে যেতে যেতে বলল
"মাত্র দু-মিনিট "
সেইদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হটাৎ আবিরের মনে পড়ল 'মাকসুরদা ', কোনো খাবার পেতে কতক্ষন লাগবে সেটার উত্তরে মাকসুরদা সব সময় বলতো "মাত্র দু মিনিট।" কিন্তু মাকসুরদা যখন কফি হাউসের কাজ ছেড়ে দিলো তখন তো ওরা সবে কলেজে উঠছে , তারপরতো তাকে আর দেখায় যায়নি , এটা কি তবে ওর ভাই বা ছেলেজাতীয় কেউ?
নাহ বেশী ভেবে লাভ নেই ,যে যার মতো কফির কাপ টেনে নিয়েছে , আবিরও একটা কাপ টেনে নিয়ে চুমুক দিলো।
রঞ্জন পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেটটা বার করে টেবিলের ওপর রেখে দিল, আবির হাত বাড়িয়ে তুলে নিলো ,
ফিল্টার-ছাড়া চারমিনার , আবির একটা বার করে ঠোঁটে রাখলো,শ্যাম দেশলাইটা এগিয়ে দিলো , আবির একটা টান দিয়ে বলল
"আঃ ন্যাংটা-চারু!! কোথায় পেলি ?"
"নিচের দোকানটায় , ফেলুদার ব্র্যান্ড গুরু "
আবির হেসে ফেলল আবার
সোমনাথ উঠে একবার জানলা দিয়ে কিছু একটা দেখা আবার ফিরে এলো , রঞ্জন বলল
"কি দেখছিলিস বাইরে বৃষ্টি পড়ছে কিনা ?"
"হুম , এখনো একটানা পড়ে যাচ্ছে থামবার কোনো নামগন্ধ নেই "
"ছাড় তো , আয় বোস কফি দিয়ে ন্যাংটা-চারু খা "
" সে তো খাবোই কিন্তু শালা খাবারটা আসতে আসতে কফিটা যে শেষ হয়ে যাবে "
"কুছ পরোয়া নেহি আরেক রাউন্ড বলে দেবো "
শ্যাম কফিটা শেষ করে কাপটা রাখতে রাখতে আবিরের দিকে তাকিয়ে বলল
"তোর গল্পটা শুনে আমার একটা ঘটনা মনে পড়ে গেল "
আবার একটা গপ্পোর গন্ধ পেয়ে সবাই বেশ নড়েচড়ে বসল
"এটাও ভৌতিক কাহিনী ?"
"নাহলে আর বলছি কেন "
"আহা ইরশাদ ইরশাদ"
শ্যাম তার গল্প শুরু করলো ,"ঘটনাটা ঘটেছিলো আমার মায়ের ছোটমেসোমশাইয়ের সাথে , তিনি ছিলেন সেযুগের
M L F পাস করা ডাক্তার , আমি আমরা ডাকতাম ডাক্তারদাদু বলে ,তাঁর আসল নাম ছিলো সূর্যশেখর মাইতি,
এই ঘটনাটা আমি নিজে তাঁর কাছ থেকে শুনেছি , তাই আমি যেভাবে শুনেছি তোদেরও সে ভাবেই বলছি
............সূর্যশেখর ডাক্তারির পরীক্ষায় পাস করে নিজের প্র্যাকটিস শুরু করেন আউলপুর গ্রামে , সে সময়ের কথা
তখন এইসব দেশ গ্রামে একজন পাস্ করা ডাক্তারের অস্তিত্ব কল্পনা করাও অসম্ভব ছিল , কলকাতা থেকে পাস করে
সূর্যশেখর কেন আউলপুরে গিয়ে চেম্বার খুললেন সেটা একটা অন্য গল্প। তাঁর নিজের গ্রাম পটাশপুর ছিল বেশ অনেকটাই দূরে , মা -বাবা কোলকাতাতে পড়াকালীনই কলেরায় মারা যান তাই গ্রামের ওপর তাঁর বিশেষ টান ছিলো না। তিনকূলে আর কেউ ছিলোনা বলেই তিনি ঠিক করেছিলেন আর্তের সেবায় জীবন কাটিয়ে দেবেন। আউলপুর গ্রাম ছিল যাকে বলে একেবারে অজ পাড়াগাঁ , পাকা-রাস্তা নেই ইলেট্রিক আলো গ্রামের চারজন বড়োমানুষের ঘরে অব্দি এসে থেমে গেছে , সামনের বিশ মাইলের মধ্যে কোনো স্বাস্থকেন্দ্র অব্দিও নেই। সূর্যশেখর এই গ্রামে এসে চিকিৎসা করতে চান শুনে শুধু সেই গ্রামের নয় আশেপাশের আরো চার-পাঁচটা গ্রামের লোকও খুব খুশি হলো। কলকাতার পাস করা ডাক্তার বলে কথা ,গ্রামের লোকেরা নিজেরাই উদ্যোগ নিয়ে একটা মাটির দোতলা ঘর বানিয়ে দিলো , একতলায় ডাক্তারখানা আর দোতলায় ডাক্তারের থাকার ব্যবস্থা , দিন কেটে যাচ্ছিলো। সন্ধ্যাবেলায় মাঝে মাঝেই গ্রামের
কেষ্ট-বিস্টুরা এসে খোঁজ নিয়ে যেতেন কোনো অসুবিধা হচ্ছে কিনা। সূর্যশেখরের বাবা মারা যাবার আগে তাঁর নামে মোটা টাকা রেখে গিয়েছিলেন, তাই আর্থিক কষ্টে তাঁকে কোনোদিনও বিশেষ পড়তে হয়নি,গ্রামের অধিকাংশ লোকই ছিল খুব গরিব ফী দেবার ক্ষমতা তাদের ছিলোনা ,তাই ডাক্তারের নাম প্রচুর হলেও টাকা বিশেষ হয়নি ,অবশ্য
তিনি এসবের ধার ধরতেন না ,খুব কড়া মেজাজের মানুষ ছিলেন তাই রোগীরা যেমন ভয় পেত তেমন শ্রদ্ধাও করত।
সূর্যশেখরের আউলপুরে ডাক্তারি শুরু করার পর প্রায়
আট-নয় মাস কেটে গেছে , একদিন সন্ধ্যেবেলা তিনি একতলায় বসে সেদিনের মতো শেষ রোগীটিকে দেখছেন , আর গ্রামের একজন দুজন করে কর্তা -ব্যক্তিরা আসতে আসতে জমায়েত হচ্ছেন । ডাক্তারের রোগী দেখা শেষ হলেই দাবার আড্ডা শুরু হবে চলবে অনেকরাত অব্দি , ডাক্তার নিজে বিশেষ দাবা না খেললেও আড্ডাটা বেশ উপভোগ করতেন, আর গ্রামের এই বয়োজোষ্ঠ অভিজাত সমাজের অনেকেই এই ডাক্তারটিকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন, কাজেই বয়সের ব্যবধানটা আড্ডায় বাধা হয়ে দাঁড়াতো না। সূর্যশেখর শেষ রোগীটিকে বিদায় করে দিয়ে , নিজের চাকরের উদ্যেশে হাঁক দিলেন
"কালু , চা বানা আর সঙ্গে পাঁপড় ভাজা , সবার জন্য "
"এজ্ঞে বাবু , বানাইতেসি "
ডাক্তার গিয়ে আড্ডায় মধ্যমনি হয়ে বসলেন , দাবার ছক বসলো , গুটি এগোলো , চা পাঁপড় এলো আড্ডা বেশ জমে উঠেছে এমন সময় কোথা থেকে কি একটা কথায় প্রসঙ্গ উঠলো , ভূতের ভয় নিয়ে ,আর ডাক্তার দুম করে বলে বসলেন তিনি ভূতে বিশ্বাস করেন না। শুনে আড্ডার সবার তো পিলে চমকে যাবার জোগাড় , ছোকরা বলে কি ???ভূত মানে না ,তার মানে ভগবানও মানে কিনা সন্দেহ , বয়োজোষ্ঠ যাদের মনে মধ্যে একটি সুপ্ত বাসনা ছিল এই যুবক ডাক্তারটিকে নিজের জামাই বানানোর তাঁরা সে আশা ত্যাগ করার কথা ভাবতে শুরু করলেন। ডাক্তারকে অবশ্য কেউই সোজাসুজি চটাতে সাহস করলেন না ,শুধু বাড়ি ফেরার আগে বৃদ্ধ মানস চক্রবর্তী বলে গেলেন ,
"দেখো বাবা , তুমি আমার নাতির বয়সী , তাই এই বুড়ো দাদুর একটা কথা রাখবে ?"
এখন সূর্যশেখর মানসবাবুকে খুবই সম্মান করতেন , কেননা যে জমিতে ওঁর এই চেম্বার ,বাড়ি সেটা এই আসলে বৃদ্ধের, ডাক্তারকে প্রথম দেখে তাঁর এতো ভালো লেগে গিয়েছিলো যে নিজে থেকে তিনি উদ্যোগ নিয়ে ডাক্তারকে এখানে বসত করিয়েছেন, তাঁর কোনো কথা অমান্য করেন কি করে
ডাক্তার বললেন
"নিঃসঙ্কোচে বলুন "
"শোনো তোমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস তোমার কাছে।মানতে ইচ্ছা হয় মেনো ,না হলে নয় , তবে বাবা একটা কথা বলি ,যদি মাঝরাতের দিকে অচেনা লোকের কাছ থেকে খুব দূরের কোনো কল আসে তাহলে বাবা চেষ্টা করো রাতে না যেতে , আর একন্তই যদি যেতে হয় তাহলে ভোরের আলো ফোটার পর যেও "
ডাক্তার প্রতিবাদ করলেন
"সেকি , আমি যে ডাক্তার রোগীর অবস্থা খারাপ শুনলে না গিয়ে থাকি কি করে বলুন তো "
মানসবাবু ,একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন ,
"জানতাম শুনবে না ,তুমি বড্ডো জেদি বাবা , ......আচ্ছা শোনো তোমার বাড়ির পশ্চিমের দিকে ইদ্রিস গাড়োয়ানের বাড়ি , চেনো ওকে ?"
"বিলক্ষণ চিনি "
"হুঁ , ও আমার খাস প্রজা , আমি ওকে বলে রাখবো , যদি যাও তাহলে ওকে নিয়ে ওর গাড়িতে যেয়ো কেমন , আর আপত্তি করোনা"
"আচ্ছা বেশ তাই সই "
"বেঁচে থাকো বাবা বেঁচে থাকো , চলি আজকে "
ডাক্তার দরজা বন্ধ করে হেসে ফেললেন কোন যুগে যে বাস করছে এরা।
এই ঘটনার পর আরো চার পাঁচ মাস কেটে গেছে , মাঝে একবার রাতের কল এসেছিলো দূরগ্রাম থেকে তবে সেখানের জমিদারের ছেলে অসুস্থ ছিল বলে জমিদার ঘোড়ার গাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।
সেইদিন ভোরবেলা থেকেই ঝড় শুরু হয়েছিল , কালু আগেরদিন গিয়েছিলো শহরে কয়েকটা দরকারি জিনিস কিনে আনতে আর ফিরতে পারেনি , সূর্যশেখরের দুদিন আগে রোগী দেখতে গিয়ে কাদায় পড়ে পা মচকে গেছে , সকাল থেকেই ঝড় বৃষ্টি চলছে দেখে বুঝলেন আজকে আর কেউ আসবেনা , কোনোরকমে নিজেনিজেই দুটি ভাতে-ভাত ফুটিয়ে
নিলেন ,দুপুরের দিকে ঝড়টা বন্ধ হলেও বৃষ্টি পড়েই যাচ্ছিল। সন্ধ্যার দিকে বুঝলেন হাল্কা জ্বরজ্বর মতো লাগছে
তাই একটু ব্র্যান্ডি খেয়ে নিয়ে , আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়লেন , বাইরে থেকে তখনও বৃষ্টি পড়ার টুপটাপ শব্দ ভেসে আসছে সেটা শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে গেলেন। ঘুমটা ভাঙলো একটা শব্দে , নিচের ডাক্তারখানার দরজাটাই সদর দরজা , আর সেটাতে কে যেন জোরেজোরে ধাক্কা দিচ্ছে আর চিৎকার করছে
"ডাক্তারবাবু ও ডাক্তারবাবু দরজাটা খুলুন। ........"
সূর্যশেখর বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লেন , একটা হ্যারিকেন হাতে নিয়ে দোতলার জানলার কাছে গিয়ে নিচে তাকালেন ,
এতক্ষনে বাইরে বৃষ্টি থেমে গিয়ে মেঘ পরিষ্কার হয়ে গিয়ে দিব্বি চাঁদ উঠেছে , সেই চাঁদের আলোয় দেখলেন ধপধপে
ধুতি পাঞ্জাবি পরা একজন ভদ্রলোক দরজার ধাক্কা দিচ্ছেন
" দাঁড়ান আসছি " বলে তিনি খোঁড়াতে খোঁড়াতে একতলায় নেমে দরজা খুললেন ,দরজা খুলে দিতেই ভদ্রলোক ঘরে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ে বললেন
"ডাক্তারবাবু শিগরির চলুন , আমার একমাত্র শ্যালক খুব অসুস্থ "
"আগে দরজাটা বন্ধ করে এসে বসুন , তারপর সব খুলে বলুন কি হয়েছে ,"
ডাক্তার এসে নিজের চেয়ারটায় বসে টেবিলের ওপর হ্যারিকেনটা রাখলেন , অন্যদিন কালু দুটো হ্যাজাক জ্বেলে দিয়ে যায় , কিন্তু আজকে এই হারিকেনই ভরসা , দেরাজে অবশ্য দুটো মোটামোটা মোমবাতি আছে দরকার পড়লে জ্বালা যাবেখন।
ভদ্রলোক দরজাটা লাগিয়ে এসে চেয়ারে বসলেন
"আপনি আসছেন কথা থেকে "
"বেলডাঙা থেকে "
"বেলডাঙা!!! সেতো অনেকদূরে , এই ঝড় বৃষ্টিতে এলেন কি করে !!!"
"আমার একটা সাইকেল আছে বৃষ্টি থামার পর তাতেই চড়ে এসেছি , আপনি একটি বার চলুন ডাক্তার বাবু আমার শ্যালক.....
"কি হয়েছে তার?"
"ঠিক বুঝতে পারছিনা আজ দুপুর থেকেই ধুম জ্বর ,একদম বেহুঁশ , সারা গা যেন আগুনের মতো তেতে আছে"
"হুমম। .. পরীক্ষা না করে তো বলা মুশকিল কি সমস্যা হয়েছে ?আপনি যা বর্ণনা দিলেন তাতে পৃথিবীর পঞ্চাশ শতাংশ অসুখ এর মধ্যে পড়ে "
"তাই তো বলছি আপনি দয়া করে একটিবার চলুন আমার সাথে , আমার স্ত্রীর একমাত্র ভাই ,আমার স্ত্রী খুব দুশ্চিন্তা করছেন ,হয়তো আমার দেরী দেখে .....
আবার দরজার ওপর দুমদুম করে শব্দ হল , ডাক্তারবাবু উঠতে যাবেন এমন সময় ভদ্রলোক বললেন
"দাঁড়ান আমি দেখছি " বলে উঠে গেলেন।
ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে সূর্যশেখরের কেমন যেন একটা খটকা লাগছিলো ,এবার তাঁর দরজা খুলতে যাওয়া দেখে খেয়াল হলো আশ্চর্য তো !!বাইরে এতো ঝড় বৃষ্টি হলো অথচ ওনার গা তো দিব্যি খটখটে শুকনো ,উনি বলছেন উনি বৃষ্টি থামার পর বেরিয়েছেন সেক্ষেত্রে রাস্তাঘাটে এখন প্রচুর কাদা কিন্তু ওনার গায়ে তো কাদার ছিটে ফোঁটাও নেই , সাইকেলে এলেও কাপড়ে কাদা লাগবেই , ডাক্তারের চোখ ভুল হবার তো কথা নয় , অজান্তেই তাঁর চোয়ালটা শক্ত হয়ে গেল , লোকটা আবার কোনো সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে আসছে নাকি?মতলবটা কি? ডাক্তার দেরাজ থেকে মোমবাতিটা বার টেবিলে রাখতে রাখতে দেখলেন ভদ্রলোক এবার একজন সুন্দরী মহিলাকে নিয়ে আসছে , মহিলাটি মুখ অর্ধেক ঘোমটায় ঢাকা , দেখলেই বোঝা যায় বেশ সমভ্রান্ত পরিবারের কেউ , এবং এনার পায়ে কালো মতো যেন কি একটা লেগে আছে তিনি এসে ডাক্তারকে দেখেই কাঁদো কাঁদো গলায় বললেন
"ডাক্তারবাবু আপনি চলুন, আমার ভাই খুব অসুস্থ , গা পুড়ে যাচ্ছে আপনি আপনি ........"
ভদ্রমহিলা কেঁদে ফেললেন , ওনার স্বামী স্বান্তনা দিতে দিতে বললেন
"আমার স্ত্রীর এই ভাই ছাড়া বাপের বাড়ির কেউ নেই, তাই উনি ........"
ডাক্তার বাধা দিয়ে বললেন
"ঠিক আপনি শান্ত হন আগে আমি আছি তো "
ভদ্রমহিলা ফুঁপিয়ে চললেন ,ডাক্তার দেরাজ থেকে আর একটা মোমবাতি বার করে দুটো মোমবাতি একসঙ্গে জ্বালিয়ে দিলেন , ভদ্রমহিলা সঙ্গে সঙ্গে
"ওমাগো ওটা কি !!!" বলে চিৎকার করে এমন জোরে হাত পা ছুঁড়লেন তাতে একটা মোমবাতি নিচে পড়ে গেল , ডাক্তারও ঘটনার আকস্মিকতায় চমকে উঠেছিলেন, তারপর বুঝলেন বিষয়টা কি , আসলে দুটো মোমবাতি জ্বালার ফলে ঘরের কোনে রাখা কঙ্কালটা ভদ্রমহিলার চোখে পড়তেই উনি ভয় পেয়েএই কান্ডটি ঘটিয়েছেন ,ডাক্তার সেটা বুঝতে পেরে হেসে বললেন
"ওটা আমার ছাত্রজীবনের সঙ্গী ওটাকে অত ভয় পাবার কিছু নেই "
বলতে বলতে ডাক্তার নিচে ঝুঁকে পড়ে মোমবাতিটা তুলতে গেলেন , মোমবাতিটা টেবলের নিচে পড়ে গেলেও নিভে যায়নি জ্বলছিল , সেই আলোতে তিনি দেখলেন ভদ্রমহিলার শাড়িটি পায়ের গোড়ালির একটু উপরে উঠে আছে ,বাকি পায়ের অনাবৃত অংশে যেটাকে তিনি শুকনো কাদা বলে ভাবছিলেন পরিষ্কার দেখতে পেলেন সেটা কাদা নয় , কালো কালো লোমে পায়ের পাতাটা ভর্তি বোধহয় গোটা পাটাই তাই , আর পায়ের আঙুলের নখগুলো বাঁকানো এবং তীক্ষ্ণ , ডাক্তার পরিষ্কার বুঝতে পারলেন এটা আর যাই হোক কোনোমতেই একজন মানুষের পা নয়, ডাক্তারের হাড় কেঁপে উঠলো , কিন্তু মাথা তিনি ঠান্ডা রাখলেন,এসব সময় ভয় পেলে চলেনা।
তারপর মোমবাতিটা তুলে চেয়ারে সোজা হয়ে বসলেন
স্বামী -স্ত্রী দুজনেই ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে আছে নিস্পলক চোখে , শেষমেষ মহিলাই বললেন
"ডাক্তারবাবু আপনি চলুন "
ডাক্তার অসম্ভব গম্ভীর গলায় বললেন
"আমি যাব কি করে বলুন তো ? দেখছেন তো পায়ের এই হাল কোনোরকমে এঘর ওঘর করছি মাত্র "
"সেটা কোনো ব্যাপার নয় আমি সাইকেল এনেছি তাতে করে আপনাকে নিয়ে যাবো "
"আর আপনার স্ত্রী ?"
"ও আপনি ভাববেন না ডাক্তারবাবু আমি হেঁটে চলে যাবো "
"নাহ সেটা হতে পারেনা , আর তাছাড়া আমার যা অবস্থা তাতে সাইকেলে চেপে যাওয়াও সম্ভব নয়।
দম্পতি চুপ করে গেল তারা একে ওপরের দিকে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করছে
ডাক্তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাদের দিকে তাকিয়ে ছিলেন , এবার বললেন
"আমি বলি কি , আমার বাড়ির পশ্চিমপাশে ইদ্রিস গাড়োয়ানের বাড়ি , ওর সাথে আমার ব্যবস্থা করা আছে আপনারা ওকে গিয়ে আমার নাম করে বলুন, ও দশ মিনিটের মধ্যে গাড়ি তৈরী করে দেবে , তাতে করে আমি আপনার স্ত্রী দুজনেই যেতে পারবো কি বলেন ?"
ভদ্রলোক একটু কিন্তু কিন্তু করছিলেন , ওনার স্ত্রী চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে ঠান্ডা স্বরে বললেন
"গাড়ি না হলে আপনি যাবেন না তাই তো , ঠিক আছে আমরা গাড়ি নিয়ে আসছি এরপর কিন্তু আর কোনো অজুহাত শুনব না। চলো "
বলেই দুজনে বেরিয়ে গেলেন ডাক্তার এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো সে দিকে কয়েক মুহূর্ত , ওরা দুজনে রাস্তায় নামামাত্রই ডাক্তার দৌড়ে এসে দরজাটায় খিল তুলে দিলেন , ডাক্তারের সারা শরীর থরথর করে কাঁপছিলো, আস্তে আস্তে দরজায় পিঠ দিয়ে তিনি মাটিতে বসে পড়লেন , বুকের ভেতর হাতুড়ি পেটের মতো শব্দ হচ্ছে। দরজাটা বন্ধ করার শব্দটা বেশ জোরেই হয়েছিল।কারণ ডাক্তার মেঝেতে বসে পড়া মাত্রই দরজায় আবার ধাক্কা শুরু হয়
"ডাক্তারবাবু ও ডাক্তারবাবু দরজাটা খুলুন না। ..............
ওই ডাক্তার খোল খোল বলছি , কি ভাবছিস দরজা লাগিয়ে বেঁচে যাবি "
ডাক্তার দুহাত দিয়ে নিজের কান চেপে ধরলো , দরজার প্রতি আঘাতের সাথে গোটা বাড়ি যেন কেঁপে কেঁপে উঠছিলো , সাথে চিৎকার কখনো দরজার সামনে, কখনো বাড়ির পিছনে, সারা বাড়ি ঘুরতে ঘুরতে দুজনে চিৎকার করে যাচ্ছিলো "ডাক্তার দরজা খোল "
কখনো অনুনয় কখনো হুমকি কখনো বা হিংস্র জীবের অপার্থিব হুঙ্কার কখনো দরজায় ভারী কিছুর আঁচড়ের শব্দ ,সেটা যে কি তা ডাক্তারের আর সাহস হয়নি দোতলায় গিয়ে দেখার , ডাক্তার দরজার সামনে চুপচাপ হাঁটুতে মুখ গুঁজে বসে রইলো আর সারা রাত সেই ধাক্কা আর চিৎকার সমানে চলে গেল , ডাক্তার একটাও জবাব দেয়নি , চুপচাপ বসে থেকেছে। ভোর হবার পর দরজায় ধাক্কা পড়াটা বন্ধ হলো কিন্তু শাসানি থামলো না ,কিন্তু ডাক্তার ওই ভাবেই ঠায় বসে রইলো। তরপর সকালবেলায় ................
শ্যামের ঠিক মতো গল্প শেষ হবার আগেই মনোজদা চারটে কফি নিয়ে হাজির হলো , টেবিলে রাখতে রাখতে বললো
"সরি গো একটু দেরি হয়ে গেল "
শ্যাম বলল
"আহা মনটা বড় কফি কফি করছিলো গো , কিন্তু বাকি খাবার কই "
মনোজদা একটু অবাক হলো
"বাকি খাবার ! তুমি তো তখন ঢোকার সময়ে আমাকে বলে এলে চারটে কফি, আমি তো সেটাই নিয়ে এলাম "
আরে তোমাকে নয় গো আর একজনকে বলেছিলাম সে এখনো নিয়ে এলোনা তুমি একটু দেখোনা "
" হ্যাঁ অবশ্যই দেখছি "
মনোজদা তক্ষুনি চলেই যাচ্ছিলো আবির ডাকলো
"আচ্ছা মনোজদা তোমার মাকসুরদাকে মনে আছে ?"
"হ্যাঁ কোনো থাকবেনা ,ঐতো তোমরা যেবারে ইস্কুল থেকে পাস্ করলে সে বছরই তো ...
"নিখোঁজ হয়ে যাই জানি , কিন্তু তার কি কোনো ছেলে বা ভাই কেউ এখানে কাজ করে ?"
"কোই নাতো , আর করলে তোমরা জানতে পারতে না ? তা ছাড়া মাকসুরের তিনকূলে কেউ ছিল বলে তো আমি জানিনা "
"হুম সেটাই "
সোমনাথ বললো
"ছাড়ো তো তুমি একটু খাবার গুলো দেখো "
মনোজদা একটু ব্যাস্ত হয়েই নিচে নেমে গেল , রঞ্জন শ্যামকে বললো
"হ্যাঁ রে তোর ওই ডাক্তার দাদু জীবিত "
"নাহ দু বছর আগে মারা গেছেন কেন রে ?"
"এমনি, আচ্ছা উনি কিসের পাল্লায় পড়েছিলেন সেটা কি উনি বুঝেছিলেন ?"
"বোধহয় , warewolf জাতীয় কিছু হবে হয়তো,এতদিন পরে সেটা ............
মনোজদা হন্তদন্ত হয়ে উপরে উঠে এলো হাতে একটা বিল
সেটা এগিয়ে দিয়ে বললো
"এটাই কি তোমাদের বিল"
আবির হাত বাড়িয়ে বিলটা নিয়ে পড়তে শুরু করলো
"ছয় কাপ কফি ,একটা চিজ স্যান্ডুউইচ ,একটা মটন কবিরাজি ,একটা কোল্ড ... .. নাহ আমরা তো শুধু কফি
আরে , এটা তো
আবির পাশের টেবিলের দিকে তাকাতে গিয়ে পুরো থ হয়ে গেল ,টেবিলটা ফাঁকা শুধু কোল্ড কফির গ্লাসটা পড়ে আছে।
অন্যরাও সেটা দেখে চুপ করে গেল , ছেলেমেয়ে দুটো কখন উঠে গেল ??এইতো শ্যামের গল্প চলছিল যখন তখনও ওদেরকে দেখা গেছে সেই একইভাবে হাত ধরাধরি করে বসে আছে, আর যদি ওরা উঠেও যায় তাহলেও সেটা তো সেটা ওদের টেবিল পেরিয়েই যেতে হবে,চারজনে মুখ চাওয়াচায়ি করলো
মনোজদা বয়স্ক মানুষ হয়তো বিষয়তা বুঝতে পেরেই ,খুব গম্বীরভাবে বললো
" আজকে সন্ধ্যেবেলায় তোমরা ছাড়া এইদিকে আর কেউ আসেনি, এই বিলটা তাহলে ............ "
কেউ কোনো উত্তর দিতে পারলো না ,
পাশের টেবিলে কোল্ড কফির গ্লাসটা তখনো পড়ে আছে।
বাইরে দোকানের শেডের তলায় সুগত আর দিতি দাঁড়িয়ে ছিলো , সুগত আস্তে করে জিজ্ঞাসা করলো
"এবার কোথায় যাবে"
দিতি সুগতর কাঁধে মাথা রাখতে রাখতে বললো
"রবীন্দ্র সরোবর ",
সুগত হাসলো,বৃষ্টির জলের ছাট ওদেরকে ঠিক স্পর্শ করতে পারছিলো না ,জলের কোন গুলো কেমন যেন পিছলে পিছলে যাচ্ছিলো। .........

No comments:
Post a Comment