Search This Blog

Saturday, 27 May 2017

দুগ্গাপুজো -2

খড়্গপুরে তরুণদা একগাদা খাবার কিনলেন ,  তারপর মুখভর্তি ডিমসেদ্ধ নিয়ে চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন
"নাও ভায়া এবার শুরু করো "
আমিও চায়ের ভান্ড হাতে নিয়ে  বলা শুরু করলাম 
"দূর্গা পূজা কবে, কখন, কোথায় প্রথম শুরু হয়েছিল তা জানা যায় না। ভারতের দ্রাবিড় সভ্যতায় মাতৃতান্ত্রিক দ্রাবিড় জাতির মধ্যে মাতৃদেবীর পূজার প্রচলন ছিল। সিন্ধু সভ্যতায় (হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারো সভ্যতা) দেবীমাতা, ত্রিমস্তক দেবতা, পশুপতি শিবের পূজার প্রচলন ছিল। দূর্গা শিবের অর্ধাঙ্গিনী সে হিসাবে অথবা দেবী মাতা হিসাবে পূজা হতে পারে। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে আছে, দূর্গা পূজার প্রথম প্রবর্তক কৃষ্ণ, দ্বিতীয় বার দূর্গা পূজা করেন স্বয়ং ব্রহ্মা আর তৃতীয়বার দূ্র্গা পূজার আয়োজন করেন মহাদেব। আবার দেবী ভাগবত পুরান অনুসারে জানতে পারি, ব্রহ্মার মানস পুত্র মনু ক্ষীরোধ সাগরের তীরে দূর্গার আরাধনা করে বর লাভে সফল হন। মূল বাল্মীকির রামায়ণে, দূর্গা পূজার কোন অস্থিত্ব নাই। কিন্তু কৃত্তিবাসী রামায়নে দূর্গাপূজার অস্থিত্ব আছে। কৃত্তিবাসী রামায়ণ-এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হল, এটি মূল রামায়ণের আক্ষরিক অনুবাদ নয়।  কবি কৃত্তিবাস ওঝা সংস্কৃত রামায়ণ বাংলা করার সময় মূল রামায়ণের বাইরের তৎলালীন সমাজে প্রচলিত বাংলার সামাজিক রীতিনীতি ও লৌকিক জীবনের নানা অনুষঙ্গ, অনেক মিথ, গল্প বাংলা রামায়ণে ইচ্ছাকৃতভাবে ঢুকিয়ে  বাংলা রামায়ণ আরো অধিক সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করেন। অন্যভাবে বলা যেতে পারে, তিনি সংস্কৃত রামায়ণ উপাখ্যানের এমনভাবে বঙ্গীকরণ বা বাংগালীকরন করেন--যা পড়লে মনে হবে, রামায়নের ঘটনা তার সমাজের আদি কাহিনী। সেখানে তিনি কালিকা পুরাণের ঘটনা অনুসরণে ব্রহ্মার পরামর্শে রামের দূর্গা পূজা করার কথা উল্লেখ করেছেন। শক্তিশালী রাবনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বিজয় নিশ্চিত করতে শরৎকালে শ্রী রাম চন্দ্র কালিদহ সাগর থেকে ১০১ টি নীল পদ্ম সংগ্রহ করে প্রাক্ প্রস্তুতি হিসাবে দূর্গা পূজা করে দূর্গার কৃপা লাভ করেন বলে কৃত্তিবাস ওঝা বর্ণনা করেছেন। তবে দূর্গা পূজার সব চাইতে বিশদ বর্ননা পাওয়া যায় মার্কন্ডুয়ে পুরানে। যেখানে মহির্ষী জৈমিনি ও মহির্ষী মার্কন্ডুয়ের কথোপকথনের ভিত্তিতে পুরাণটি রচিত হয়। এই পুরাণের মধ্যে তেরটি অধ্যায় দেবীমহাত্ম্যম নামে পরিচিত। বাংলায় শ্রীশ্রী চন্ডি নামে সাতশত শ্লোক বিশিষ্ট দেবী মহাত্ম্যম পাঠ আছে--যা দূর্গা পূজার প্রধান ও অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে পূজার আসরে স্থায়ী হয়ে গেছে । 


সনাতন ধর্মের আর্য ঋষিরা সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের প্রতীক হিসাবে দেবী দূর্গার আশীর্বাদ লাভের জন্য আরাধনা করতেন। মার্কন্ডুয়ে পুরান মতে, চেদী রাজবংশের রাজা সুরাথা খ্রীষ্ঠের জন্মের ৩০০ বছর আগে কলিঙ্গে (বর্তমানে ওড়িষ্যা) Duseehera নামে দূর্গা পুজা প্রচলন করেছিল। নেপালে Duseehera বা Dashain নামেই পুজা হয়। যদিও প্রাচীন ওরিষ্যার সাথে নেপালের পূজার যোগসূত্র আছে কিনা সে তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। পুরাণ মতে, দূর্গা পূজার ইতিহাস আছে কিন্ত ভক্তদের কাছে সেই ইতিহাস প্রামানিক নয়, বিশ্বাসের। "


তরুণদা আর বৌদি শুধু নয় পাশের বাঙ্কের একজন মাঝবয়সী ভদ্রলোকও আমাদের  কথা বেশ মন দিয়ে শুনছিলেন
এবার তিনি হটাৎ বলে উঠলেন
"আপনারা কি জানেন পরিব্রাজক হিউয়েন সাং কে নিয়ে দুর্গাপুজোর একটা গল্প আছে "
আমি মাথা নেড়ে জানালাম যে আমি সেটা জানিনা , তখন ভদ্রলোক নিজেই শুরু করলেন
"
চীনা ভাষায় রচিত বৌদ্ধ ধর্মের ব্যাখায় বিভ্রান্ত হয়ে তিনি বৌদ্ধ ধর্মের মূল পান্ডুলিপি সংগ্রহে ৬৩০ সালে ভারত সফরে আসেন। ভারত বর্ষের নানা বিহারে বিদ্যা অর্জন করেন। ৬৩৫-৬৪৩ পর্যন্ত দীর্ঘ আট বছর তিনি হর্ষবর্ধনের রাজ সভায় ছিলেন। তবে তার কাহিনী দূর্গা, কালী, কালীর আরেক রূপ চন্ডি নাকি বন দেবীকে নিয়ে-তা নিয়ে মতবেধ আছে। তবে তার রচনায় উল্লেখ করেছেন, হর্ষবর্ধন এর সময়ে দস্যু তস্কর এর উপদ্রব খুব বেশি ছিল এবং তিনি নিজেও একাধিক বার দস্যুর হাতে নিগৃহিত হয়েছিলেন। তার প্রবাস জীবনের কোন এক সময়ে গঙ্গাপথে  এই পরিব্রাজক কোন বৌদ্ধ বিহারে যাচ্ছিলেন। পথে দস্যুর কবলে পড়লেন। দস্যুরা তাকে দেবী দূর্গার সামনে বলি দেওয়ার জন্য নিয়ে যাচ্ছে। কেউ মনে করেন, বন দেবী, কেউ মনে করেন কালী, কারণ প্রাচীনকালে নরমুন্ড ভোগ দেবার বিষয়টি বনদেবী বা কালী দেবীর জন্য প্রযোজ্য ছিল--যা এখন পাঠা দিয়ে পূরণ করা হয়। দূর্গা মাকে খুশী করার জন্য নরমুণ্ড ভোগ দেবার বিষয়টি ইতিহাস থেকে জানা যায় না। যাই হোক, বলির পূর্ব প্রস্ততি প্রায় শেষ, এমন সময় প্রচন্ড বেগে ঝড় ছুটে এল। সব আয়োজন ঝড়ের কবলে লন্ডবন্ড হয়ে গেল। ডাকাতরা জান বাঁচাতে পালাতে লাগল। সেই সুযোগে হিউয়েন সাংও পালিয়ে যান। "
আমরা তিনজনেই হেসে ফেললুম , ভদ্রলোকও মুচকি  মুচকি হাসতে  লাগলেন।

 শাস্ত্রে ‘দুর্গা’ নামটির ব্যাখ্যা নিম্নোক্তরূপে প্রদত্ত হয়েছে : 
দৈত্যনাশার্থবচনো দকারঃ পরিকীর্তিতঃ। 
উকারো বিঘ্ননাশস্য বাচকো বেদসম্মত।। 
রেফো রোগঘ্নবচনো গশ্চ পাপঘ্নবাচকঃ। 
ভয়শত্রুঘ্নবচনশ্চাকারঃ পরিকীর্তিত।। 

- ‘দ’ অক্ষর দৈত্যনাশক, উ-কার বিঘ্ননাশক, ‘রেফ’ রোগনাশক, ‘গ’ অক্ষর পাপনাশক ও অ-কার ভয়-শত্রুনাশক। অর্থাৎ, দৈত্য, বিঘ্ন, রোগ, পাপ ও ভয়-শত্রুর হাত থেকে যিনি রক্ষা করেন, তিনিই দুর্গা। অন্যদিকে শব্দকল্পদ্রুম অনুসারে, “দুর্গং নাশয়তি যা নিত্যং সা দুর্গা বা প্রকীর্তিতা” – অর্থাৎ, দুর্গ নামক অসুরকে যিনি বধ করেন তিনিই নিত্য দুর্গা নামে অভিহিতা। আবার শ্রীশ্রীচণ্ডী অনুসারে এই দেবীই ‘নিঃশেষদেবগণশক্তিসমূহমূর্ত্যাঃ’ বা সকল দেবতার সম্মিলিত শক্তির প্রতিমূর্তি। 


সুকুমার রায়ের অসাধারণ হাস্যরসের ধারা-1

গ্রন্থ সমালোচনা 

সুকুমার রায়ের অসাধারণ হাস্যরসের ধারা
      
                           অমৃতেন্দু রায় 


{প্রবন্ধ}

সুকুমার রায়ের আশ্চর্য জগৎ

কৃষ্ণরূপ চক্রবর্তী 

আনন্দ পাবলিশার্স 
কলকাতা -৯
৩১৫.০০


                                                
                                                                        এখনকার ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা সুকুমার রায় ও তার লেখার সঙ্গে কতটা পরিচিত বলা শক্ত। ত্রিশ চল্লিশ বছর আগেও সুকুমারের কবিতার অন্তত দু’এক লাইন অথবা তার ‘হযবরল’-র সঙ্গে পরিচয় ছিল না এরকম লোকের সংখ্যা খুব কমই ছিল। এখনকার বাস্তববাদী যুক্তিনির্ভর ও তথ্যনিবিড় জীবনযাত্রায় অবাস্তবতা ও রূপকথার প্রবেশ নিষিদ্ধ। কল্পনাশক্তির অভাব ও আবেগহীন গতিময়তা জীবনকে যান্ত্রিক করে তুলতে পারে। শরীরকে কর্মক্ষম রাখতে সুষম খাদ্যের মতই মনকে সুন্দর সজীব রাখার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। বাঁধাধরা ছকের মধ্যে কল্পনা-জগতের স্বপ্নময়তা ও অনাবিল হাস্যরস আমাদের সে প্রয়োজন কিছুটা মেটায়। উদ্ভট খেয়াল রসের অফুরন্ত ভাণ্ডার সুকুমার রায় তাই চিরকালই প্রাসঙ্গিক।                               
                               আলোচ্য গ্রন্থটিতে লেখক সাধ্যমত বিস্তৃতভাবে  সুকুমার রায়ের জীবন পরিচয় থেকে  শুরু করে তার অতুলনীয় কাজ সবেরই আলোচনা করেছেন। ১২৭ পৃষ্ঠার এই গ্রন্থটি আটটি পরিচ্ছেদে বিভক্ত , যথা 
১)সময় জীবন মন
২)ছড়া  ,কবিতা
৩)গল্প
৪)ফ্যান্টাসির জগৎ
৫)নাটক
৬)অপ্রধান রচনা , প্রবন্ধ 
৭)প্রশান্ত মহালনবিশকে লেখা একটি গুরুত্বপূর্ণ চিঠি
৮)পরিশিষ্ট 

                                                                 

                                                                            প্রথম পরিচ্ছেদে লেখক বর্ণনা করেছেন সুকুমার রায়ের বংশপরিচয় ,জন্ম ,ছোটবেলা ,শিক্ষা ,বিলেত যাত্রা ,বিবাহ ইত্যাদি ঘটনা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত রচনা
                                                         "শেষ নাহি যে শেষ কথা কে বলবে
                                                             আঘাত হয়ে দেখা দিলে
                                                                আগুন হয়ে জ্বলবে "
   এটি  তিনি সুকুমারের মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী সুপ্রভা দেবীকে নিজের হাতে লিখে পাঠিয়েছিলেন বলে জানা যায়,(পৃষ্ঠা ১৪ দ্রষ্টব্য )
               
                                                                           দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে লেখক আলোচনা করেছেন সুকুমার রায়ের ছড়া ও কবিতাগুলি ,প্রধানতঃ "আবোল তাবোল " ও "খাই খাই " এই দুটি বইতেই অন্তর্ভুক্ত ,সাধারণত কথাবার্তার সূত্রে অযৌক্তিক বা অর্থহীন কথাবার্তাকে  আমরা ননসেন্স বলি ,কিন্তু শিল্পের মধ্যে এই জাতীয় রচনায় এক রকমের  রস এর সৃষ্টি হয় যা আপাতঃকৌতুক দ্বারা আমাদেরকে অবিশাস্য জগৎ এ  নিয়ে যায়। এই ধরণের ছড়ায় যে জগৎ সৃষ্টি হয় তাকে বলা যায় biazarre . তাঁর 
কবিতার সঙ্গে ছিল ‘হাঁসজারু’, ‘বকচ্ছপ’, ‘বিছাগল’, ‘গিরিগিটিয়া’ প্রভৃতি সন্ধিযুক্ত কল্পিত প্রাণীর বিচিত্র সব ছবির সমাহার। তার ‘আবোল তাবোল’ বইয়ের সব কবিতাই ‘সন্দেশে’ ছাপা হয়েছে, তবে অনেক সময়ে ভিন্ন নামে। যেমন, ‘বাবুরাম সাপুড়ে’ (‘সন্দেশ’র নাম ‘বাপরে’, আষাঢ়, ১৩২৮), ‘রামগরুরের ছানা’ (‘সন্দেশে’র নাম ‘হেস’ না!’, বৈশাখ, ১৩২৫), ‘নোটবই’ (‘সন্দেশে’র নাম ‘জিজ্ঞাসু’, বৈশাখ, ১৩২৭) ইত্যাদি। পত্রিকায় ‘আবোল তাবোল’ নাম দিয়ে বেরিয়েছে তার বিখ্যাত কবিতা ‘খুড়োর কল’, ‘দাঁড়ে দাঁড়ে দ্রুম’, ‘গানের গুঁতো’ প্রভৃতি। বেশির ভাগ কবিতার বিশ্লেষণ করে লেখক দেখিয়েছেন নিছক রঙ্গ ব্যাঙ্গ ,হাস্যরস  তির্যক সমালোচনা
ইত্যাদি নিয়ে তাঁর ছড়াগুলি আপাত ভাবে নিরীহ মনে হলেও তারা সন্ধান দেয় এক আশ্চর্য দৃষ্টিভঙ্গির যা  অসম্ভব পরিণত মেধার ফসল। বেশির ভাগ ছড়াগুলির তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণ করে তাদের অন্তর্নিহিত মানে টা লেখক সবার সামনে তুলে ধরেছেন। 

                                                                           
                                                                                 তৃতীয় পরিচ্ছেদের আলোচনার বিষয় বস্তু গল্প ,বিখ্যাত পাগলা দাশু সিরিজের লেখাগুলি  থেকে শুরু করে আরও অন্যান্য গল্প যেমন দ্রিঘাংচু ,ডাকাত নাকি ,বাজে গল্প , আজব সাজা ইত্যাদি গল্পের অত্যন্ত যত্ন সহকারে বিশ্লেষণ করেছেন। সুকুমার রায়  উপকথা ,লোককথা,নীতিকথা  জাতীয় লেখা যেমন আছে তেমন এই আছে দেশ বিদেশের মনীষীদের জীবনী , বিজ্ঞানের ওপর লেখা অসাধরণ রচনা
লেখক সাধ্যমত বিস্তৃত আলোচনা করেছেন তাও কিছু কিছু লেখা আলোচনা করে উঠতে পারেননি।

                                                                            চতুর্থ পরিচ্ছেদটি আয়তনে সর্ব বৃহৎ ,"ফ্যান্টাসির জগৎ " শিরোনামে এই পরিচ্ছেদে লেখক বিস্তৃত আলোচনা করেছেন এবসার্ড শিল্পের্ সংজ্ঞা , বিশেষ্যত্ব নিয়ে এবং প্রচলিত তত্বের সাথে সুকুমারের চেতনার পার্থক্য কি তা নিয়ে আলোচনা দিয়ে শুরু করেছেন এবং ক্রমে ক্রমে গ্রিক নাটক এর আল্টিমেট রিয়ালিটি থেকে শুরু করে ফ্যান্টাসির সংজ্ঞা বিচার (পৃষ্ঠা ৭৩) অব্দি গিয়ে আলোচনা  বাক নিয়েছে
লুইস ক্যারোল এর "এলিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড " এবং "থ্রু দা লুকিং গ্লাস " এর মতো কাল জয়ী  রচনার সাথে সুকুমার রায়ের  "হ জ ব র ল " এর তুলনামূলক আলোচনায় , একইসাথে উঠে এসেছে  "গালিভার ট্রাভেলস ", "টি লস্ট ওয়ার্ল্ড "
প্রসঙ্গ ও। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ্য  লেখক শুধু  অন্য  রচয়িতার  রচনার সাথে তুলনামূলক আলোচনা করেই  থামেননি
তিনি ফ্যান্টাসির  গ্রাউন্ড রুল সম্পর্কেও সুন্দর ধারণা দিয়েছেন।



Saturday, 20 May 2017

দুগ্গাপুজো -1


"এই দুগ্গাপুজো এলেই বাঙালি  দলবাজি  তে  কেমন ক্ষেপে ওঠে দেখেছ , একদল  বাড়ি থেকে বেরোতে চায়না , আরেক দল বাড়িতে  থাকতে চায়না "
নিজের সিটে বসতে বসতে তরুণদা র কথাটা শেষ  হবার আগেই upper bunk  থেকে বৌদির মুখ ঝামটা  উড়ে এলো   , 
"তা তুমি কোন দল এর শুনি ?" 
" আমি বাপু কোন  দলাদলিতে নেই , কলকাতার   পাঁ পোঃ  আর ভালোলাগছেনা  তাই সোজা  কেরালা  পালাচ্ছি , ওখানে গিয়ে কানদুটো কে একটু শান্তি দেয়া যাবে, কি বল সুরজিৎ ?"
আমি হাতের বইতা মুড়ে সোজা হয়ে বসলাম ,
"দাদা কেরালা গিয়ে বাঁচবেন ভেবেছেন , ওখানেও কিন্তু দূর্গা পূজা হয় "
"কি বলছো হে !!!!"
" হ্যাঁ  হয় , নবরাত্রির মতো দশ দিন ধুমধাম হয়না বটে কিন্তু শেষের তিন দিন হৈচৈ  হয় , অষ্টমীর দিন ওদের হয়   আয়ুধ্যা পূজা , বাড়ির যন্ত্র-পাতির  সেদিন পুজো হয় , তারপরের দিন মানে নবমীর দিন ওদের  হয় স্বরস্বতী পূজা , আমদেরএখনে যেমন বাচ্চাদের হাতে খড়ি  দেয়া হয় সেই রেওয়াজ ওখানেও  আছে "
"বোলো কি ভায়া , বাংলার বাইরেও দুর্গাপূজা হয় "
"হ্যা কোনো হবেনা , বিহার,ওডিশা,ত্রিপুরা ,কর্ণাটক ,গুজরাট  এমন কি ইউরোপ , আমেরিকাতেও হয় "
"বাপ্ রে" 
"আচ্ছা ঠাকুরপো কলকাতায় কবে থেকে দূর্গা পুজো  হচ্ছে " 
"সাবর্ণ  চৌধুরীদের পৈত্রিক বাড়ি বড়িশায় ,১৬১০ সাল থেকে হয়ে আসছে ,মনে করা হয় কলকাতা সংলগ্ন জায়গায় 
এটাই প্রথম বড় পুজো, এখনও  এই পুজো চলে আসছে তবে এখন পরিবার এর ভাগ হয়ে যাবার পর সব   তরফ থেকেই  মিলিয়ে মোট  সাত টা পুজো হয়
 ছয় টা বড়িশা তে  আর একটা  বিরাটিতে  ., এছাড়াও আছেন  আন্দুলের জমিদার  দত্ত চৌধুরী পরিবার , তাঁরাও  ১৬০৯ থেকে আটচালাতে  দূর্গা পূজা করে আসছেন , বাংলার এইটা  অন্যতম  প্রাচীন দুর্গাপুজো 
তবে দূর্গা পূজা কে যদি ফ্যাশন  আর  স্টেটাস সিম্বলে পরিণত করলেন  শোভাবাজার এর রাজা নবকৃষ্ণ দেব , ১৭৫৭ তে  পলাশীর যুদ্ধে ইংরেজদের জয় উপলক্ষ্যে এই পুজো শুরু হয় , ইংরেজদের আদর করে মদ মাংসের বন্যা  ছুটিয়ে দিয়ে  , বাই  নাচের আসর বসিয়ে , সে এক বিরাট কান্ড  শুরু হয় , আস্তে আস্তে কলকাতার সমস্ত বড়লোকদের কাছে 
দুর্গাপূজা নিজের বড়মানুষী দেখানোর অস্ত্র হয়ে ওঠে  , রানী  রাসমণি ও পুজো চালু করেছিলেন তার বসতবাটিতে 
তবে সাবেকি মতেই পুজো হতো ,
তখন এক একজন বড়মানুষ পুজোর সময় যা যা করতেন আমাদের শুনলে স্রেফ গুল মনে হবে , কেউ  বাঈজি নাচবে বলে নিজের হল ঘর এ ২ইঞ্চি পুরু সন্দেশের কার্পেট  বিছিয়েছেন , ভাবতে পারছো একটা হলঘরএর মেঝে গোটাটাই সন্দেশ দিয়ে মোড়া , কেউবা প্রতিমা বিসর্জন দেবার সময় ঠাকুরের দামি গয়না  সমেত বিসর্জন দিচ্ছেন , আসছে বছর আবার হবে। 
বারোয়ারি পুজো শুরু  হয়  ১৯০৯ সালে  ভবানিপুরে , ভবানীপুর সনাতন  ধর্মোৎসাহিনী  সাভার  উদ্যোগ্যে 
তারপর কলেজ স্ট্রিট সার্বজনীন  দুর্গোউৎসব ১৯১৫, Shyampukur Adi Sarbojanin ১৯১১ তে , সিকাদারবাগান এর পুজো শুরু হয় ১৯১৩ তে যা এখন বাগবাজার সার্বজনীন , আরো কত আছে। ......
এখন তো বোধহয়  কম করে ২০০০ বারোয়ারী  পুজো হয় 

তরুণদা ,বৌদি  ২জনই চুপ 
আমিও থামলাম ,খড়্গপুর এলো বলে , হটাৎ বৌদি জিজ্ঞাসা করে বসলো 
আচ্ছা ঠাকুরপো তোমার তো কাজ পুরান নিয়ে , মা দুর্গার পূজা ঠিক কে শুরু করেছিলেন বোলো তো ?
বলছি খড়্গপুরটা যাক