Search This Blog

Saturday, 27 May 2017

সুকুমার রায়ের অসাধারণ হাস্যরসের ধারা-1

গ্রন্থ সমালোচনা 

সুকুমার রায়ের অসাধারণ হাস্যরসের ধারা
      
                           অমৃতেন্দু রায় 


{প্রবন্ধ}

সুকুমার রায়ের আশ্চর্য জগৎ

কৃষ্ণরূপ চক্রবর্তী 

আনন্দ পাবলিশার্স 
কলকাতা -৯
৩১৫.০০


                                                
                                                                        এখনকার ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা সুকুমার রায় ও তার লেখার সঙ্গে কতটা পরিচিত বলা শক্ত। ত্রিশ চল্লিশ বছর আগেও সুকুমারের কবিতার অন্তত দু’এক লাইন অথবা তার ‘হযবরল’-র সঙ্গে পরিচয় ছিল না এরকম লোকের সংখ্যা খুব কমই ছিল। এখনকার বাস্তববাদী যুক্তিনির্ভর ও তথ্যনিবিড় জীবনযাত্রায় অবাস্তবতা ও রূপকথার প্রবেশ নিষিদ্ধ। কল্পনাশক্তির অভাব ও আবেগহীন গতিময়তা জীবনকে যান্ত্রিক করে তুলতে পারে। শরীরকে কর্মক্ষম রাখতে সুষম খাদ্যের মতই মনকে সুন্দর সজীব রাখার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। বাঁধাধরা ছকের মধ্যে কল্পনা-জগতের স্বপ্নময়তা ও অনাবিল হাস্যরস আমাদের সে প্রয়োজন কিছুটা মেটায়। উদ্ভট খেয়াল রসের অফুরন্ত ভাণ্ডার সুকুমার রায় তাই চিরকালই প্রাসঙ্গিক।                               
                               আলোচ্য গ্রন্থটিতে লেখক সাধ্যমত বিস্তৃতভাবে  সুকুমার রায়ের জীবন পরিচয় থেকে  শুরু করে তার অতুলনীয় কাজ সবেরই আলোচনা করেছেন। ১২৭ পৃষ্ঠার এই গ্রন্থটি আটটি পরিচ্ছেদে বিভক্ত , যথা 
১)সময় জীবন মন
২)ছড়া  ,কবিতা
৩)গল্প
৪)ফ্যান্টাসির জগৎ
৫)নাটক
৬)অপ্রধান রচনা , প্রবন্ধ 
৭)প্রশান্ত মহালনবিশকে লেখা একটি গুরুত্বপূর্ণ চিঠি
৮)পরিশিষ্ট 

                                                                 

                                                                            প্রথম পরিচ্ছেদে লেখক বর্ণনা করেছেন সুকুমার রায়ের বংশপরিচয় ,জন্ম ,ছোটবেলা ,শিক্ষা ,বিলেত যাত্রা ,বিবাহ ইত্যাদি ঘটনা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত রচনা
                                                         "শেষ নাহি যে শেষ কথা কে বলবে
                                                             আঘাত হয়ে দেখা দিলে
                                                                আগুন হয়ে জ্বলবে "
   এটি  তিনি সুকুমারের মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী সুপ্রভা দেবীকে নিজের হাতে লিখে পাঠিয়েছিলেন বলে জানা যায়,(পৃষ্ঠা ১৪ দ্রষ্টব্য )
               
                                                                           দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে লেখক আলোচনা করেছেন সুকুমার রায়ের ছড়া ও কবিতাগুলি ,প্রধানতঃ "আবোল তাবোল " ও "খাই খাই " এই দুটি বইতেই অন্তর্ভুক্ত ,সাধারণত কথাবার্তার সূত্রে অযৌক্তিক বা অর্থহীন কথাবার্তাকে  আমরা ননসেন্স বলি ,কিন্তু শিল্পের মধ্যে এই জাতীয় রচনায় এক রকমের  রস এর সৃষ্টি হয় যা আপাতঃকৌতুক দ্বারা আমাদেরকে অবিশাস্য জগৎ এ  নিয়ে যায়। এই ধরণের ছড়ায় যে জগৎ সৃষ্টি হয় তাকে বলা যায় biazarre . তাঁর 
কবিতার সঙ্গে ছিল ‘হাঁসজারু’, ‘বকচ্ছপ’, ‘বিছাগল’, ‘গিরিগিটিয়া’ প্রভৃতি সন্ধিযুক্ত কল্পিত প্রাণীর বিচিত্র সব ছবির সমাহার। তার ‘আবোল তাবোল’ বইয়ের সব কবিতাই ‘সন্দেশে’ ছাপা হয়েছে, তবে অনেক সময়ে ভিন্ন নামে। যেমন, ‘বাবুরাম সাপুড়ে’ (‘সন্দেশ’র নাম ‘বাপরে’, আষাঢ়, ১৩২৮), ‘রামগরুরের ছানা’ (‘সন্দেশে’র নাম ‘হেস’ না!’, বৈশাখ, ১৩২৫), ‘নোটবই’ (‘সন্দেশে’র নাম ‘জিজ্ঞাসু’, বৈশাখ, ১৩২৭) ইত্যাদি। পত্রিকায় ‘আবোল তাবোল’ নাম দিয়ে বেরিয়েছে তার বিখ্যাত কবিতা ‘খুড়োর কল’, ‘দাঁড়ে দাঁড়ে দ্রুম’, ‘গানের গুঁতো’ প্রভৃতি। বেশির ভাগ কবিতার বিশ্লেষণ করে লেখক দেখিয়েছেন নিছক রঙ্গ ব্যাঙ্গ ,হাস্যরস  তির্যক সমালোচনা
ইত্যাদি নিয়ে তাঁর ছড়াগুলি আপাত ভাবে নিরীহ মনে হলেও তারা সন্ধান দেয় এক আশ্চর্য দৃষ্টিভঙ্গির যা  অসম্ভব পরিণত মেধার ফসল। বেশির ভাগ ছড়াগুলির তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণ করে তাদের অন্তর্নিহিত মানে টা লেখক সবার সামনে তুলে ধরেছেন। 

                                                                           
                                                                                 তৃতীয় পরিচ্ছেদের আলোচনার বিষয় বস্তু গল্প ,বিখ্যাত পাগলা দাশু সিরিজের লেখাগুলি  থেকে শুরু করে আরও অন্যান্য গল্প যেমন দ্রিঘাংচু ,ডাকাত নাকি ,বাজে গল্প , আজব সাজা ইত্যাদি গল্পের অত্যন্ত যত্ন সহকারে বিশ্লেষণ করেছেন। সুকুমার রায়  উপকথা ,লোককথা,নীতিকথা  জাতীয় লেখা যেমন আছে তেমন এই আছে দেশ বিদেশের মনীষীদের জীবনী , বিজ্ঞানের ওপর লেখা অসাধরণ রচনা
লেখক সাধ্যমত বিস্তৃত আলোচনা করেছেন তাও কিছু কিছু লেখা আলোচনা করে উঠতে পারেননি।

                                                                            চতুর্থ পরিচ্ছেদটি আয়তনে সর্ব বৃহৎ ,"ফ্যান্টাসির জগৎ " শিরোনামে এই পরিচ্ছেদে লেখক বিস্তৃত আলোচনা করেছেন এবসার্ড শিল্পের্ সংজ্ঞা , বিশেষ্যত্ব নিয়ে এবং প্রচলিত তত্বের সাথে সুকুমারের চেতনার পার্থক্য কি তা নিয়ে আলোচনা দিয়ে শুরু করেছেন এবং ক্রমে ক্রমে গ্রিক নাটক এর আল্টিমেট রিয়ালিটি থেকে শুরু করে ফ্যান্টাসির সংজ্ঞা বিচার (পৃষ্ঠা ৭৩) অব্দি গিয়ে আলোচনা  বাক নিয়েছে
লুইস ক্যারোল এর "এলিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড " এবং "থ্রু দা লুকিং গ্লাস " এর মতো কাল জয়ী  রচনার সাথে সুকুমার রায়ের  "হ জ ব র ল " এর তুলনামূলক আলোচনায় , একইসাথে উঠে এসেছে  "গালিভার ট্রাভেলস ", "টি লস্ট ওয়ার্ল্ড "
প্রসঙ্গ ও। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ্য  লেখক শুধু  অন্য  রচয়িতার  রচনার সাথে তুলনামূলক আলোচনা করেই  থামেননি
তিনি ফ্যান্টাসির  গ্রাউন্ড রুল সম্পর্কেও সুন্দর ধারণা দিয়েছেন।



No comments: