Search This Blog

Thursday, 14 December 2017

প্যারাডক্স
১২
বিশ্বনাথ মন্দিরের অজানা গলি
২০১৫


                                                                      আমি একেবারে হুব্বা বনে গেলাম , কাকা বলে কি !!!! বেকার বোঝা বইছি , মেয়েটা আমার ভাগ্যে নেই !!!হ্যাঁ কথা গুলো  মোটেই  মিথ্যা নয় কিন্তু সেটা তো অন্য কারুর টের পাবার কথা নয়। আমার ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া মুখটা দেখেই বোধহয় ভদ্রলোক মুচকি হেঁসে আমার পাশটায় এসে বসলেন
"বাঙালী ???"
হিন্দির শুদ্ধ বাংলায় প্রশ্ন  শুনে ,আমি আর নতুন করে অবাক হতে পারলাম না ,
"হ্যাঁ ,"
"তোমাকে দেখে খুব একটা সুস্থ বলে মনে হচ্ছে না "
"হ্যাঁ , শরীরটা আচমকাই  খারাপ লাগতে শুরু করলো, মাথাটা কেমন যেন ঘুরে গেল তাই বসে পড়লাম ,একটু জল...... ...... "
আমার জীব শুকিয়ে গিয়েছিল , জড়িয়ে জড়িয়ে কোনোমতে  কথাগুলো বললাম, ভদ্রলোক যেন ব্যাস্ত হয়ে উঠলেন ,
"হ্যাঁ হ্যাঁ তাই তো , দাঁড়াও বাবা আমি দেখছি "
বলে উনি ব্যাস্তভাবেই বাড়ির ভিতরে ঢুকে গেলেন।
আমি দেয়ালে হেলান দিয়ে চোখ বুঝলাম , কি আশ্চর্য ,আমি জানি আমি বেকার বেকার পূর্বাশার পিছনে পড়ে আছি
এই ইনভেসমেন্টের কোনো রিটার্ন হবার আশা নেই , তাও জিনিসটা দিন কে দিন কেমন যেন একটা অভ্যেসে পরিণত হয়ে যাচ্ছে , লোকজন খিল্লি করছে ,খোরাক করছে , কখনও সামনে করছে আর পিছনে তো সবসময় করছে। কিন্তু তাও ছাড়তে পারছি কই, ক্রমেই যেন আরো গভীরে তলিয়ে যাচ্ছি। এখন কথাটা হচ্ছে এই ভদ্রলোক আমার মনের কথাটা টের পেলেন কি করে , থট রিডিং ? এঁনাকে দেখে তো সন্ন্যাসী বলেতো মনে হলো না , এই মহল্লার সঙ্গে মানানসই পোশাক-আশাক পরেছিলেন।তাহলে কি ইনি যোগী সাধক ? হতে পারে , আমি আমার ছোট্ট জীবনের অভিজ্ঞতায় একটা জিনিস দেখেছি , যাঁদের সত্যি সত্যি অতীন্দ্রিয় ক্ষমতা  আছে তাঁরা সবাই সাধক মানুষ , হয় তান্রিক নয় যোগী ,
হতেই পারে ইনি যোগী পুরুষ তাই আমার মনের কথা বুঝে গেলেন , কিন্তু সেটাই যদি হয় তাহলে তো মহা বিপদ , ইনি যদি প্রতি সেকেন্ডে সেকেন্ডে আমার মনের ভিতরে উঁকি মারতে শুরু করেন তখন তো কেলো হয়ে যাবে। পালিয়ে যাবো ? না সম্ভব নয় মাথাটা এখনো সত্যি সত্যি একটু ঘুরছে , আর আমি গলিটা কোথায় গিয়ে উঠছে সেটাও জানি না
উফফফ কি জ্বালা !!!!!কি যে করি এখন , ধুর ভাল্লাগে না
"এই নাও ", কথাটা শুনে চোখ মেলে চাইলাম ,দেখি আমার এই বসে বসে আলবাল ভাবনাচিন্তার সময়ই উনি কখন যেন এক লোটা জল আর একটা রেকাবিতে দুটো প্যাঁড়া নিয়ে হাজির হয়েছেন। লোটা আর রেকাবিটা নামিয়ে দিয়ে বললেন
"এই নাও,এতো তেষ্টায় শুধু জল খেওনা  "
আমি কথা না বাড়িয়ে লোটা তুলে চুমুক দিলাম , জলের স্বাদটা যেন একটু অন্যরকম লাগলো হালকা কর্পূরের গন্ধ পেলাম ,এক নিঃশ্বাসে হাফ  লোটা জল শেষ করে থামলাম , আহঃ সত্যিই  জল মানেই জীবন, জি -বাংলা  নয়, প্যাঁড়া দুটো একসাথে  মুখে পুরে দিলাম , আহা খাঁটি ক্ষীরের জিনিস মুখে দিতেই যেন গলে গেল, লোটার বাকি জলটা গলায় ঢেলে দিয়ে একটু খানি জল হাতে নিয়ে চোখে মুখে দিলাম ,আহঃ শান্তি।এতক্ষন  ভদ্রলোক আমার কার্যকলাপ হাঁসি মুখে  দেখছিলেন ,এবার বললেন
"আরেকটু জল খাবে ?"
আমি বললাম
"নাহ , ঠিক আছে , আপনাকে যে কি বলে ধন্য-............."
"কিছু বলারই দরকার নেই , তা তোমার শরীরটা ঠিক লাগছে এখন ?"
"হ্যাঁ এখন একটু ঠিক লাগছে "
"আচ্ছা এই জায়গাটা ঠিক কোথায় বলুন তো , আসলে আমি অন্নপূর্ণার প্রসাদ খেয়ে বেরিয়ে গলিটা গুলিয়ে ফেলেছি তারপর উল্টোপাল্টা ভাবে হাঁটতে হাঁটতে এখানে হাজির হয়েছি,এবার এই জায়গাটা আমার একদমই অচেনা তাই বুঝতে পারছিলাম না ফিরবো কি করে ,এমন সময় মাথাটা একটু ঘুরে গেল তাই এখানে বসে পড়লাম । " একটু মিথ্যাই বললাম , বেশি ভাং খেয়ে নেশা করেছি বলতে কেমন যেন একটা লাগছিলো ,ইনি যদি সত্যি সত্যি থট রিডার হন তাহলে এতো ক্ষনে নিশ্চই সব বুঝে গেছেন।
"তা বেশ করেছ , আর তুমি খুব বেশি দূরেও আসোনি , এই যে গলিটা দিয়ে তুমি এলে সেটায় আবার  ফিরে  গেলে দেখবে ডান দিকে একটা সবুজ বাড়ি আছে তার পাশেই একটা ছোট্ট সরু কানা গলি আছে , ওটায় ঢুকে সোজা হাঁটতে হাঁটতে গলিটা একজায়গায় প্রায় বুজে  এসেছে একটা বাড়ির পাঁচিল অর্ধেকটা রাস্তা ঢাকা দিয়ে দিয়েছে ,একটু কষ্ট করে
ওই পাঁচিলের ফাঁক দিয়ে এগিয়ে গেলেই দেখতে পাবে একদম বিশ্বনাথ মন্দিরের কাছেই এসে পড়েছো , বুঝেছো "
আমি সুবোধ বালকের মতো মাথা নাড়লাম , দিব্যি জলের মতো সোজা রাস্তা , আমি রোয়াক ছেড়ে উঠে দাঁড়াতে যেতেই  বিপত্তিটা ঘটলো , মাথাটা একটু ঘুরে গেল যেন ,কোনোমতে দেওয়াল ধরে নিজেকে সামলালাম।
"তুমি এক কাজ করো বাবা , তুমি  আমার সাথে ভিতরে এসো, একটু বিশ্রাম করো তারপর নাহয় যেয়ো "
"নানা আপানার আবার কোন
"আমি একাই থাকি , কাজেই কারোর কোনো সমস্যা হবেনা , তুমি এসো "
আমি আর কথা বাড়ালাম না , উনি দরজা খুলে ভিতরে ঢুকে গেলেন , আমি চুপচাপ ওনাকে ফলো করলাম।  বেশ পুরানো বাড়ি , একদম চৌকো ছাঁদের ঠিক কত তলা সেটা বুঝতে পারলাম না  , মাঝখানে একফালি উঠোন সেখানে একটুখানি রোদ  এসে পড়েছে , বেশির ভাগ ঘরই তালাবন্ধ , বারন্দায় ধুলো ময়লা , পুরানো জিনিস পত্র ডাঁই হয়ে পড়ে আছে , উঠোনে একটা খাটিয়া পাতা
"বসো  ওখানে , আমি আসছি " বলে উনি লোটা আর রকাবিটা নিয়ে একটা ঘরে ঢুকে গেলেন , আমি খাটিয়ায় আধশোয়া হয়ে বাড়িটা দেখতে লাগলাম , কম করে চারতলা হবে , পুরানো জাফরী কাটা বারান্দা , ছাদটা জাল দিয়ে ঘেরা না হলে বান্দরের উপদ্রবে টেঁকা সম্ভব নয় , এই বাড়িটা দেখে দিব্বি বোঝা যাচ্ছে এখানে কেউ থাকেনা ,এতো বড় বাড়ি একেবারে খাঁ খাঁ করছে ,উনি থাকেন কি করে !!!! আমার হটাৎ খেয়াল হলো আরে  ভদ্রলোকের নামটাই তো জানা হলো এহে এটা ঠিক হয়নি , ভদ্রলোকের নামটাও অব্দি জানিনা আর সোজা যার খাটিয়ায় এসে গড়াগড়ি দিচ্ছি
এটা মোটেই ভদ্রোচিত ব্যবহার নয় , ভাঙের নেশাটা আজকে বড্ডো অবাধ্যতা করছে। নিজেকে শাস্তি  দিলাম নাহ দিন কতক আর মোটেই  ভাং খাবো না  সে পরিস্থিতি যাই হোক না কেন।
খটাস খটাস শব্দ শুনে পিছনে ফিরে দেখি উনি আসছেন , আর এই নিস্তব্দ বাড়িতে ওনার পায়ের খড়ম থেকে খটাস খটাস আওয়াজটা আসছে, উনি এসে আমার সামনে বসলেন।
আমি এবার জিজ্ঞাসা করলাম
"আজ্ঞে আপনার নাম টা .........
"আমার নাম সানন্দগতি , আমি অবশ্য এখানে থাকিনা , মাঝে মাঝে মন কেমন করে তখন চলে আসি, এই বাড়িটাও ঠিক আমার নয় , আমার এক পুরানো বন্ধুর পৈত্রিক বাড়ি , সে অসুস্থ আর এখানে আসতে পারে না  তাই আমাকে বাড়ির ভারটা দিয়েছে , আমি মাঝে মাঝে এলে থাকি     "
"ওহ , আচ্ছা আচ্ছা , বুঝলাম   আমার নাম......" আমার  কথা শেষ হবার আগেই জবাব উড়ে এলো
"আমি জানি ", সানন্দর  ঠোঁটের কোনে আবার মুচকি হাঁসি , আমি   আর কৌতুহল সহ্য করতে পারলাম না
"আপনি কি মানুষের মনের কথা পড়তে পারেন "
"না , কয়েকজনের অনুভূতিগুলো বুঝতে পারি , এই যেমন তোমার মনে এখন কি চলছে সেটা দিব্যি বুঝতে পারছি ,
চিন্তা মিথ্যা হতেই  পারে , অনুভূতিরা  মিথ্যা হয়না, তাই মানুষের অনুভূতিগুলোকে বুঝে বুঝে মানুষটাকেই বুঝতে পারি , খুব একটা শক্ত জিনিস নয় চেষ্টা করলে তুমিও পারবে  "
আমি কেমন যেন মোহগ্রস্থের মতন সানন্দর কথাগুলো শুনছিলাম , মনে পড়লো কোনো এক আজগুবি কল্পবিজ্ঞান সিনেমায় যেন এমন একটা কিছু দেখেছিলাম , Telipath নয় Impath . কিন্তু সেতো নেহাতই  সিনেমা ছিলো , কে জানে বাপু হতেও পারে , ইনি আমার নাড়িনক্ষত্র দিব্যি টের পাচ্ছেন বিষয়টা নিঃসন্দেহে বিপদজনক , এই অবস্থায় ভয় পাওয়াটাই  স্বাভাবিক  কিন্তু মানুষটা এতো সহজ সরল যে ওনাকে দেখে ভয় পাওয়াটাই অস্বাভাবিক। 
"আচ্ছা আপনি থাকেন কোথায় "
"অনেক দূরে গো , আয়ামদ্বীপে মা কুয়াটার মন্দির আছে আমি সেখানের পুরোহিত "
" আয়াম দ্বীপ আবার কোথায় , গঙ্গাসাগরের আসে পাশে নাকি ?"
"হ্যাঁ বাবা ঠিক ধরেছো ,     গঙ্গাসাগরের ঠিক পাশে নয় তবে ওইদিকেই।
"বাপরে সেতো অনেক দূর , আপনি ওতো দূর থেকে এখানে এসেছেন!!!!! "
"হ্যাঁ বাবা , বললাম  না মন কেমন করলে মাঝে মাঝে আসি আর তা ছাড়া এখানে আমাদের একটা ..........."
উনি কথা শেষ না করেই আচমকা উঠে দাঁড়ালেন ,যেন হটাৎ করে কিছু মনে পদে গেছে
"বাবা আমাকে একটু বেরোতে হবে, একটা কাজ ছিল একদমই ভুলে গেছিলাম , ওকি তোমাকে উঠতে হবে না তুমি বিশ্রাম করো আমি এখুনি আসছি ,"
বলে আমাকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই উনি উঠে বেরিয়ে গেলেন , দরজাটাও বন্ধ করলেন না , আমার অনেকক্ষন ধরেই চোখ জুড়ে আসছিলো , এবার আমি একটু গা এলিয়ে দিলাম , সানন্দগতি, নামটা বেশ অদ্ভুত , আচ্ছা আমি ঠিক শুনলাম তো ,ওনার নাম আনন্দগতি নয় তো !!!!


শুয়ে শুয়ে যে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম নিজেও বুঝতে পারিনি , মোবাইলের রিঙে  ঘুমটা ভাঙলো , চোখ খুলে প্রথমে বুঝতে পারলাম না কোথায় আছি , তারপরই সব মনে পড়ে গেল , নম্বরটা জয়িতার ,আমি ফোনটা তুললাম
"হ্যালো "
"কিরে কোথায় আছিস ?"
"এই একটু ঘুমাচ্ছিলাম রে (হাই )"
"আচ্ছা শোন আজকে ননীর ট্রিট মনে আছে তো ?"
"হ্যাঁ রে মনে আছে , আমি বেরোবো এবার "
"ঠিক আছে চলে আয় , দেরি করিসনা কেমন "
"হুমম , যাচ্ছি (হাই )"
ফোনটা রেখে উঠে বসলাম , কতক্ষন ঘুমালাম কে জানে , উঠোন থেকে রোদ সরে গেছে , বাড়িটা আবঝা অন্ধকার , আমি সানন্দকে খুঁজতে গিয়ে দেখি দরজা তখন হাট করে খোলা , আশ্চর্য উনি কি এখনো ফেরেননি নাকি ?
বাড়িটার ভেতর থেকে একটা তক্ষক যেন ডেকে উঠলো , আমি খাটিয়া ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম , নেশা কেটে গেছে ,
আর এই পড়ন্ত বিকালে এই পুরানো বাড়িটায় আমি একদম একলা এইটা মনে পড়তেই কেমন যেন একটা অস্বস্তি হতে লাগলো , এই বাড়িটা  এই গলিটা যেন বাইরের পৃথিবীর থেকে একদমই আলাদা যেন বাইরের কোনো শব্দ গন্ধ কিছুই এখানে টের পাওয়া যাচ্ছেনা  , আমার আর ভালো লাগলো না     আমি খোলা দরজা দিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। সানন্দর ডাইরেকশন মনে ছিল , সেই মতো কানা গলিতে ঢুকে কোনোমতে পাঁচিলের ফাক দিয়ে গলে বিশ্বনাথ মন্দিরের গলিতে উঠলাম , লোকজন ,হৈচৈ, চিৎকারে  মনে হলো যেন চেনা দেশে ফিরে এলাম , গোধুলিয়া মোড়ের দিকে হাঁটা শুরু করলাম , দেরি হয়ে গেছে আজকে যে ননীর ট্রিট দেবার কথা  সেটা একেবারেই ভুলেই গেছিলাম , হুঁ হুঁ  জাতা ট্রিট নয় একেবারে খোদ বিয়ের থুড়ি  নতুন সংসারের ট্রিট  একি ছাড়া যায়, ননী আমাদের মধ্যে প্রথম যে পালিয়ে বিয়ে করে বৌকে নিয়ে সোজা এখানে হাজির হয়েছে , সে এক অন্য গল্প , রীতিমতো যাকে বলে থ্রিলার।
(চলবে )

বি দ্র - ভালো লাগলে ,Please share

আগের পর্বের লিঙ্ক -

No comments: