Search This Blog

Wednesday, 6 December 2017

প্যারাডক্স
১০
ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাস
২০১৫

আমাদের উনিভার্সিটির ক্যাম্পাসের মধ্যে একটা ব্যাপার ছিলো , যেটা এখানের কাউকে  বলে বোঝানো সম্ভব নয়। প্রথমত  IIT খড়্গপুর ছাড়া এ রাজ্যে আর কোথাও ওতো  বড়ো ক্যাম্পাস (মায় একটি কচি এয়ারপোর্ট সমেত )আছে বলে আমি অন্তত জানি না ,দ্বিতীয়ত    গঠনগত দিক দিয়ে বিশ্বভারতী খানিকটা একরকম হলেও সাইজে একটু ছোটোই আর তৃতীয়ত  আমি কালিদাস তো দূর হরিদাসও নই ,নেহাৎ এক তুচ্ছ ব্লগার  তাই  খুব দরকার না পড়লে অনৰ্থন ক্যাম্পাসের বিশদ বর্ণনা দিয়ে লোকজনকে বোর করবো না। তা  বলতে নেই , ইউনিভার্সিটি আমাদের কিছু মোক্ষম সুযোগ সুবিধা দিয়েছিলো  বটে , যার মধ্যে একটা ছিল হেলথ কার্ড। ভর্তি হবার সময় আই  কার্ড, লাইব্রেরি কার্ড ,পাস-বুক ইত্যাদির সাথে হেলথ কার্ডও করতে হয়েছিল কিন্তু এর মহিমা টের পেয়েছিলাম  পরে, এই হেলথ কার্ড থাকলে দু লক্ষ টাকা পর্যন্ত যেকোনো চিকিৎসা ব্যবস্থা একদম ফ্রী ছিল , ডাক্তার ,হাসপাতাল ওষুধ কোন কিছুর জন্যই টাকা লাগতো না, আর আমাদের মধ্যে অনেকেই বাড়ি থেকে প্রথমবারের জন্য বাইরে বেরিয়েছিল কাজেই তারা অনেকেই অনেকবার অসুস্থ হয়েছে , বড়ো ব্যারামের  জন্য  মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল  আর ছোট অসুখের জন্য হেলথ সেন্টার দুটোই আমার বিলক্ষণ চেনা।
তাই পূর্বাশার ফোনটা কেটে লঙ্কামোড়ে দৌড়ে আসতে আসতে হিসাব করছিলাম হেলথে আছে মানে নিশ্চয় খুব বড়সড়  কিছু হয়নি। লঙ্কামোড়ে পৌঁছে মানিব্যাগটা খুলে একটা জ্যান্ত সমস্যার মুখোমুখি হতে হলো , আগের রাতেই টাকা তুলেছিলাম আর সবই পাঁচশো টাকার নোট(বর্তমানে যেটা  প্রাক্তন), আর তার বাইরে নোট
বলতে একটা ফাটা এন্টিক দশ টাকা।  আজকে আন্তর্জাতিক প্রেম দিবস আর এই লঙ্কায় প্রচুর গেস্ট হাউস , হোটেল আছে যারা ঘন্টা হিসাবে ঘর ভাড়া দেয় , তাই মোড়ের মাথায় সব কটা ওষুধ দোকানেই তুমুল ভিড় আর এ মুলুকে ওষুদের দোকান ছাড়া কেউ চট করে ফোকটে খুচরো দিতে চায় না. যাই হোক একটা মুদির দোকানে ঢুকে একটা জালি দেহাতি গপ্পো ফেঁদে কোনোরকমে খুচরো যোগাড় করে একটা রিকশা ভাড়া করে সোজা হেলথ সেন্টার রওনা দিলাম।
হেলথ সেন্টারটা ছিল IIT এর খানিকটা আগে আমাদের হোস্টেলের বন্ধুরা মাঝে মাঝেই রুমে বসে বোর হলে বা
সরবতের জন্য চিনি কম পড়লে বা কাফ সিরাপ দিয়ে নেশা করার ইচ্ছা হলে ওখানে হানা দিতো , কাফ সিরাপটা একেবারে অখাদ্য ছিল ওতে কিছুই হতো না এমনকি কাশিও  সারতো না কিন্তু পেট খারাপের নামে ors এনে শরবত করে আমরা অনেকবার খেয়েছি।   
হেলথ সেন্টারে পৌঁছে  রিকসা কাকাকে ভোজপুরীতে বললাম " রুগী ভেতরে আছে , তুমি দাড়াও আমি এখনই নিয়ে আসছি তোমার গাড়িতেই ফিরব "
ভিতরে ঢুকে দেখি , পূর্বাশার মেস মেট  শর্মিলা আর তার পার্টটাইম বেনারসী বয়ফেরেন্ড লাট্টুরাম(আসল নাম নয় তবে শর্মিলার পিছনে টানা দু বছর লাট্টুর মতো ঘুরেছিল তাই এ ইনাম)  দাঁড়িয়ে আছে ,
আমাকে দেখে শর্মিলা একটা বাঁকা হাঁসি হেসে বললো
"এই তো ঠিক হাজির হয়ে গেছে "
 আমার চোয়ালটা শক্ত হয়ে গেল ,
"কোথায় আছে "
"ওই যে ওই ঘরে "
শর্মিলা আঙ্গুল তুলে ডিসপেনসারি দেখিয়ে দিলো , আমি জিজ্ঞাসা করলাম
"ঠিক হয়েছেটা কি বলতো "
লাট্টুরাম মুচকি হেঁসে বললো "কাট দিয়া" আমি চমকে গেলাম
"মানে !!!!! কে কার কি কেটে ফেললো আবার " 
"তুই যা নিজে গিয়ে দেখ " বলে শর্মিলা খ্যাক খ্যাক করে খ্যাঁকশেয়ালের মতো হাসতে লাগলো , সঙ্গে লাট্টুরামও খি খি করতে লাগলো।  আমি বিরক্ত হয়ে ডিস্পেন্সারির রুমে ঢুকে গেলাম , ঢুকে  দেখি পূর্বাশা কোনের দিকে একটা বেঁচে মুখ নিচু করে বসে আছে আর একজন বয়স্কা নার্স কিছু একটা বলছে , আমি ওই দিকে এগিয়ে গেলাম।
ওই বেঞ্চটা হলো  ইনজেকশন নেবার ওয়েটিং প্লাটফর্ম , পূর্বাশার আগে আরো দুজন আছে ,একটা ছেলে যে হাপুস নয়নে ফ্যাঁচ ফ্যাঁচ করছে আর তার প্রেমিকা পাশে বসে গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে সান্তনা দেবার চেষ্টা করছে। আমি পূর্বাশার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম , একটু আগেও যে কেঁদে ফাটিয়ে দিয়েছে সেটা চোখ মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে , আমি ঝুকে পড়ে আলতো করে জিজ্ঞাসা করলাম ,
"কি হয়েছে"
কোনো উত্তর নেই
"ওই কি হয়েছে ?"
"তুই এলি কেন !!!! কে আসতে বলেছিলো তোকে !!! এমনিতেই বাইরে শর্মিলা আছে আবার তোকে নিয়ে যাতা কথা রটাতে শুরু করবে , এমনিতেই আমার খারাপ সময় যাচ্ছে ..........
কথা গুলো কানে গেল না , যাঃ শালা  একী নাটক , যার  জন্য চুরি করি সেই বলে গরুচোর!!!!!!!! আপদমস্তক   জ্বলে গেল
"ঠিক আছে, আমি চলে যাচ্ছি "
বলে পিছন ফিরে চলে আসতে যাবো এমন সময় জ্যাকেটের হাতায় টান পড়লো ,ঘুরে দেখি আবার চোখের লক গেট
ভাঙবে ভাঙবে করছে ,
"তুই আমাকে ,মেরে ফেল "
আমার পেট থেকে রবীন্দ্রনাথের গল্পের বঞ্চিত হেরোর মতন একটা দীর্ঘশ্বাস উঠে আসছিলো , কপ করে গিলে ফেললাম,এই মেয়েটা আমাকে শান্তি দেবেনা।
"তোর ঠিক কি হয়েছে ?"
"কুকুরে কামড়েছে "
"কুকুর কথা থেকে এলো !!!! কি কুকুর? কতটা কামড়েছে ? ডাক্তার দেখেছে !!!??"
"মেহুলীদের মেসের কুকুর , দাঁত বসিয়ে দিয়েছে "
আমি থ হয়ে গেলাম, আমরা হাতে গোনা কয়েকজন শহরের মধ্যে নদীর দিকটায় থাকতাম , মেহুলীরাও আমার পরের পাড়ায় থাকে , ওদের মেসের মালিকের কুকুরটাকে আমি দেখেছি খুদে একটা স্প্রিৎজ , দেড় খানা মুরগির মতো চেহারা হবে খুবজোর, আমি কুকুর অত্যন্ত পছন্দ করি কাজেই কোনো সুস্থ কুকুর কোনো মানুষকে কামড়াবে এটা হজম করতে আমার একটু কষ্টই হয় তারপর ওই পুঁচকে মাল !!!
আমি অতিকষ্টে হাসি চেপে জিজ্ঞাসা করতে যাবো
তুই এমন কি করছিলিস যার জন্য কুকুরটা তোকে কামড়ালো , এমন সময় পাশে একটা
"আলো বাপ্পলো " চিৎকার শুনে নড়ে উঠলাম।  দেখলাম সেই ছোকরাকে ডাক্তার ইনজেকশন দিচ্ছে এটা তার চিৎকার
সেই বয়স্ক নার্স এসে এবার পূর্বাশাকে  দেখে
"অভি তুমহারি বারী আয়েগী "
তারপর আমাকে দেখে ফিক করে হেঁসে গড়গড় করে যেটা বললেন সেটার সারমর্ম হলো
যে কুত্তায় কামড়েছে সেটা কতটা সুস্থ সেটা জানা নেই কাজেই ৬টা সুঁই (ইঞ্জেকশান), লাগাতে হবে দুটো আজকেই আর বাকি গুলো ডেট দিয়ে দেয়া হবে , আমি যেন ঠিক মতো এসে সেগুলো দিইয়ে নিয়ে যাই , এমনি ছোট বেশি না ডাক্তারবাবু বলেছেন ভয়ের কিছু নেই , ওষুধ লাগিয়ে দিয়েছেন , এই বাঙ্গালী লড়কি শুধু শুধু রোনাধোনা করছে আমি যেন একে  একটু বুঝিয়ে বলি, এই যে ছেলেটা চিৎকার করছিলো ও পার্কে প্রেম করছিলো আর সেই সময় বাঁদরে কামড়ে দিয়েছে , আমি যেন সেরকম কিছু না করি ,বাঁদরে কামড়ালেও একই ইনজেকশন নিতে হবে।  আমি সুবোধ বালকের মতন ঘাড় নাড়লাম।
আর উল্লেখযোগ্য কিছু হলো না শুধু ইনজেকশন দেবার সময় পূর্বাশা আমার হাতটা আঁকড়ে খামচে ধরেছিলো।
কাউন্টার থেকে সব ওষুধ নিয়ে ,পরের ইনকেকশনের জন্য ছাপ্পা লাগিয়ে পূর্বাশাকে ধরে ধরে  বাইরে এনে দেখি
শর্মিলা আর লাট্টুরাম ভেগে গেছে , আমি বললাম
" আমি রিকশা পার্ক করিয়ে রেখেছি , চল তোকে রুমে পৌঁছে দিই "
রিকশা কাকা আমাকে কিছু একটা বলতে গিয়ে এহেন রুগী দেখে চুপ করে গেল , রিকশায় ওঠার পর  শুধু আমাকে জিজ্ঞাসা করলো
এবার  কোথায় নিয়ে যেতে হবে।
আমি বললাম রবিদাস পার্ক  চলো , রিক্সাকাকা আবার আমাকে একটা নোংরা হাসি দিলো , রিক্সা চলতে শুরু করলো
পূর্বাশা আমার কাঁধে মাথা রেখে চোখবুঝে পড়ে আছে ,ওকে দেখে কেমন জানি মায়া হলো  আহা রে বেচারি
হটাৎ মনে পড়ে গেল চেতন ভগতের রেভোলুশন  ২০-২০ উপন্যাসের এর নায়ক-নায়িকা ওই রবিদাস পার্কেই প্রেম করতে আসতো , আমিও সেই চুলোতেই যাচ্ছি কিন্তু প্রেমটা আমার বোধহয় আর এই জন্মে করা হয়ে উঠবে বলে মনে হচ্ছে না.........
(চলবে )

বি দ্র - ভালো লাগলে  share please

No comments: