Search This Blog

Tuesday, 12 December 2017

প্যারাডক্স
১১
বেনারস,২০১৫

গরীবের নিকোলাস স্পার্কস চেতন ভগতের লেখার আমি খুব একটা ভক্ত নই , কিন্তু ভদ্রলোকের  প্রায় সব কটা উপন্যাসই একবার করে পড়েছি , "রেভলুশান ২০-২০" টা তারওপর আবার বেনারসে বসেই পড়া কাজেই একটা বেশ অন্যরকম ফিল অনুভব করেছিলাম , হ্যাঁ তবে এতটা বাড়াবাড়ি রকমের অতি নাটকীয়তা কারুর জীবনে হওয়া সম্ভব নয় সেটা বেশ বুঝেছিলাম, তাই উপন্যাসের হেরো -হিরোর জায়গায় নিজেকে বসানোর কোনো রকম চেষ্টাও  করিনি।
কিন্তু আজকে রিকশাটা যখন রবিদাস পার্কে এসে থামলো এক সেকেন্ডের জন্য মনে হলো , জীবনটা উপন্যাসের মতো হলে বোধহয় মন্দ হতো না। রিকশা থেকে পূর্বাশাকে কাঁচের বাসনের মতো সাবধানে  নামালাম।রিকশাকাকা বললো
বিল হয়েছে পঁচাশি টাকা , আমি একটা একশোর নোট বাড়িয়ে দিলাম , কাকা মাথা নেড়ে বললো  খুচরো নেই ,আমিও কাঁধ নাচিয়ে বললাম আমার কাছেও নেই , কাকা এবার একগাল হেসে বললো ,আরে তোমরা তো পার্কে যাবে টিকিট কাটার সময়  খুচরো তো  ওখানেই করে দেবে। আমি জগৎ  সংসারের ওপর থেকে হাল ছেড়ে দিলাম, হায় রে  শেষ পর্যন্ত রিকশাকাকা অব্দিও  আমার অদেখলাপনা নিয়ে খিল্লি করে দিলো, আমি আর কি বলবো !!!! আমাকে অবশ্য মুখ খুলতে হলো না
পূর্বাশাই  গম্ভীর ভাবে জানালো , আমরা পার্কে যাবো না আমাদের বাড়িটাই এখানে। রিকশাকাকা পূর্বাশার উৎকট  গম্ভীর মুখটা দেখে আর বিশেষ কথা বাড়ালো না ,শুধু  আমার কাছ থেকে টাকাটা  নিয়ে সামনের দেশিয়ালি ভাইয়ের কাছে কুল্লার (খুচরো ) করাতে চলে গেল.,  পূর্বাশা চুপ করে রইলো , টাকা ফেরত নিয়ে , আমরা হাঁটা শুরু করলাম।
শহরের সমস্ত নোংরা জল একটা খাল দিয়ে বয়ে এসে গঙ্গায়  পড়েছে, পূর্বাশার আস্তানা সেই খালের ধারের একটা সাততলা বাড়িতে , পার্কের সামনের রাস্তাটা  থেকে একটু এগিয়ে একটা সাঁকো পেরিয়ে নিচে নেমে গেছে সেই উৎরাই আর খালপাড় ধরে হাঁটলে মিনিট পাঁচেক। আমরা চুপচাপ সেই উৎরাই দিয়ে নেমে মেসের সামনের গলির মুখটা অব্দি এসেছিলাম এখন সময় পূর্বাশা হটাৎ করে আমার হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বললো
"তোকে আর আসতে হবে না , তুই অনেক করেছিস আমার জন্য, আর  অনেক বেলা হয়ে গেছে তোর স্নান খাওয়া হয়নি ,তুই রুমে ফিরে যা , শর্মিলা ফিরে অনেক কিছু বানিয়ে বলবে হয়তো বলেও দিয়েছে এতক্ষনে বাকিরা হয়তো ব্যালকনিতে দাঁড়িয়েও আছে তোকে আমার সাথে  দেখবে বলে , তুই বুঝবি না আমাকে কত কিছু সহ্য করে চলতে হয়  .................  "
আমি আর অবাক হলাম না , কথাও বাড়ালাম না , কারণ ওর এই  কথাগুলোর  জবাব দেওয়া আর অরবিন্দ কেজরীবালের মোদির বিরুদ্ধে ভোটে দাঁড়ানো দুটোই সমান অর্থহীন, তাই আমি আর কথা না বাড়িয়ে জ্যাকেটের পকেটে হাত ঢুকিয়ে একটা চকোলেট বার করে পূর্বাশার হাতে ধরিয়ে দিলাম , পূর্বাশা এবার একটু ভ্যাবাচ্যাকা  খেয়ে গেল ,ও বুঝেই উঠতে পারলো না চকোলেটটা আমি কখন কিনলাম, আমতা আমতা করে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলো
আমি শুনলাম না , মাল চালান দিয়ে সোজা এবাউট টার্ন নিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম , পিছন থেকে যেন আবঝা শুনতে পেলাম "ওই শোন্ "আমি ইচ্ছা করেই  শুনলাম না , জোরে জোরে পা চালালাম।রাস্তায় উঠে এসে খেয়াল হলো জব্বর খিদে পেয়েছে সকালে সেই হাতি দেখাবার সময় কফি আর দুপিস পাউরুটি খেয়েছি সেসব কখন পাকস্থলী থেকে লোপাট হয়ে গেছে। কিছু ভালো লাগছিলো না মেজাজ একেবারে বেগুনপোড়া হয়ে গিয়েছিলো , রুমে ফিরতে আর ইচ্ছা হলো না আমি রাস্তার উল্টোদিকে হাঁটা লাগলাম। বড়রাস্তায় গিয়ে অটো ধরে সোজা গোধুলিয়া মোড়ে চলে গেলাম , চেনা সরবতের দোকানে গিয়ে সরবতের অর্ডার দিয়ে ভিতরে গিয়ে বসলাম , দোকানি আমাকে ইশারায় জিজ্ঞাসা করলো কয় চামচ ভাং দেবে
আমিও দুটো আঙ্গুল দেখিয়ে দিলাম। 
 এক চুমুকে সরবতের গ্লাসটা খালি করে মনটা একটু ঠান্ডা হলো ,এই দোকান টা আমার বড়ো প্রিয় , লোকে মন খারাপ হলে বা উইকেন্ডে বারে বা পাবে যায় আর আমি আসি এখানে। টাকা মিটিয়ে বাইরে এসে দাঁড়ালাম , ভাঙের অ্যাকশন শুরু হতে এখনও কিছুক্ষন বাকি আছে। আমি গোধুলিয়া মোড় থেকে বিশ্বনাথ মন্দিরের দিকে হাঁটা লাগলাম।
অনেককাল ছোটবেলায় একবার বাবা মার সাথে বৃন্দাবন গিয়েছিলাম ,টানা আট -দশ দিন ছিলাম সেখানে , কিন্তু তিন চার দিনের মাথায় বিরক্তি ধরে গিয়েছিলো , সরু সরু রাস্তা ,রাস্তার ওপরে ল্যাম্পপোস্টে  ছিনতাইবাজ বাঁদর ,খোলা নর্দমা তাতে ঘোৎঘোৎ করছে শুয়োর , কাদা ,নোংরা ভিড়  দেখে দেখে একেবারে  ঝাঁট জ্বলে গিয়েছিলো ,তা একদিন বাবার সাথে বেরিয়ে পড়ে আর ধৈর্য রাখতে পারলাম না , জিজ্ঞাসা করেই ফেললাম
"আচ্ছা বাবা , এই জায়গাটা যদি কৃষ্ণের লীলাভূমিই হয় তাহলে জায়গাটা এত্তো নোংরা কেন ?"
বাবা হো হো করে হেসে ফেলেছিলো , তারপর বলেছিলো
"তুই এই জায়গাটাকে নোংরা বলছিস , বেনারস গেলে দেখবি সেই জায়গাটা আরো বেশি নোংরা " স্কুলে পড়তাম , তাই তখন আমার কাছে বৃন্দাবন আর বেনারসে  দুটোতে খুব বেশি তফাৎ ছিল না। পরে এই ধেড়ে বয়সে কাশীবাসী হয়ে বুঝেছি বাবার কথাটা একই সাথে সত্যি এবং একই সাথে মিথ্যে , A compelte paradox, কারণ সব ময়লা তো আর রাস্তায় গোবরের মতো পড়ে থাকেনা কিছু ময়লা মানুষের ভেতরেও থাকে। প্রথমবার গোধুলিয়া মোড় দেখিয়ে বাবা বলেছিলো "এই জায়গাটা এতো বিখ্যাত কেন জানিস "
"নাহঃ , কোনো আইডিয়া নেই "
"বেনারসের যত বিখ্যাত বাঈজী সব এখানে থাকতো ", বাবার কথা শুনে আমি হাঁ হয়ে গেছিলাম
"আচ্ছা বাবা এখন আর থাকে না ?" বাবা আমার কথার জবাবে শুধু বলেছিলো
"সামনে এগো , রাস্তায় কাদা আছে দেখে হাঁট "
কথাটা মনে পড়তেই হাসি  পেয়ে গেল  , যতবারই  গোধুলিয়া মোড়ে  এসেছি এই স্মৃতিটা ঠিক মাথাচাড়া দিয়েছে। আমি বিশ্বনাথ মন্দিরের গলিতে  ঢুকে পড়লাম , ক্ষিদেটা আস্তে আস্তে বেড়েই চলেছিল , আমি ভারতবর্ষের নানাজাতের লোকজন, ষাঁড় ইত্যাদি কাটিয়ে গলির তস্য গলিতে  ঢুকে গেলাম, আমার মতলব সোজা ছিল অন্নপূর্ণার প্রসাদ খাবো
কেননা Its open to all .
প্রচন্ড টক দক্ষিণ ভারতীয় কায়দায় রান্না করা ভোগ খেয়ে যখন বাইরের গলিতে এলাম ততখনে আমার নেশা বেশ চড়ে গেছে , সাধারণত জানতাম ভাং খেয়ে মিষ্টি খেলে চড়ে যায় কিন্তু টক  খেলে যে দ্বিগুন চড়ে সেটা যা ছিল না।
বিশ্বনাথ মন্দিরের গলির মধ্যে একটা বৈশিষ্ট আছে , গলির মুখ থেকে শুরু করে শেষ অব্দি প্রচুর দোকান আর সব কটাই প্রায় এক রকম দেখতে , হাত চারেক চওড়া গলি তাতে সব সময় জাতের মানুষ, ষাঁড়  যাতায়াত করছে, আর এই শহরটা যে তাদের বাপের সম্পত্তি তা তাদের আচার আচরণেই দিব্বি বোঝা যায়। এবার এই মেইন গলির সাথে আরো অসংখ্য সাব গলি মিনি গলি যোগ হয়েছে আর সব মাইল মিশে একটা জালের মতো বিছিয়ে আছে , দোকানগুলো  থেকে দোকানদাররা  ডাকাডাকি করছে , সূর্যের আলো বেশিরভাগ জায়গায় ঢোকেনা  বললেই  চলে , চিৎকার আলো  আঁধারি ,পরিবেশ একই রকম দেখতে মোড় এই সব মিলিয়ে এই  জায়গা এক  জটিল গোলকধাঁধা।
এই প্রথম টের পেলাম আমি হাঁটতে পারছিনা চোখ জ্বালা জ্বালা করছে , কায়দা করে মেইন গলি থেকে শর্টকাট করে
একটা দুহাত চওড়া মিনি গলিতে ঢুকেছিলাম , নেশার ঘোরে রাস্তাটি কখন  গুলিয়ে ফেলেছি নিজেও বুঝতে পারিনি
ফলে ১০ মিনিট হেঁটেও যখন মেইন গলিতে ফিরতে পারলাম না তখন আর রিস্ক নিলাম না , কোন চুলোয় এসেছি জানিনা কিন্তু নেশাটা একটু কাটিয়ে নিজেকেই পথ খুঁজে নিয়ে বেরোতে হবে ,কিন্তু মাথা টলছিলো , ধপ করে একটা বাড়ির রোযাকে বসে পড়লাম আর পারছিনা , দুহাত চওড়া গলি উঁচু বাড়ি গুলোর ছাত একটার সাথে অন্যটা প্রায় জুড়ে আছে কাজেই গলিতে সূর্যের আলো বিশেষ আসছে না বললেই চলে , আচ্ছা এরকম কোনো বাড়িতেই কি মোগনলাল মেঘরাজ থাকতো ???আলো  আঁধারি মাখা একটা মিষ্টি গোলকধাঁধায় যে আমি ফেঁসে গেছি সেটা বেশ বুঝতে পারলাম । খুব জল তেষ্টা পাচ্ছিলো , জীব শুকিয়ে যাচ্ছিলো , ভাবছিলাম কোনো বাড়ির দরজায় ঠকঠক করবো কিনা  এমন সময় আমার পাশের দরজাটি খুলে , একজন ভদ্রলোক বাইরে এলেন , ধুতি পরা গায়ে চাদর , পায়ে খড়ম
বোধহয় পন্ডিত বা পুরোহিত জাতীয় কিছু একটা হবেন।  ভদ্রলোক বেরিয়ে এসে আমাকে একবার দেখলেন তারপর সামনে আমাকে এবার  ভালো করে দেখে নিয়ে বললেন
"বহুত ফালতু বোঝ বহেরাহে হো বেটা , উসে উতার দো  ওহ লাড়কী তুমহারি কিসমত মে নাহী হায় "
আমি  একেবারে বুরবক  বনে গেলাম , আজ এসব হচ্ছেটা কি !!!!!!!
(চলবে )

বি দ্র - please share ,

আগের পর্বের লিংক -     

No comments: