প্যারাডক্স
৩
সরস্বতী বয়েস হোস্টেল
লঙ্কা মোড় ,২০১৩
রাত পৌনে একটা
সিগারেটটা ধরানোর ঠিক পরেই গলা দিয়ে মাকড়শার মতো গলগল করে কাশি বেরিয়ে এলো ,খ্যাকশেয়ালের মতো খ্যাক খ্যাক করে কাশতে কাশতে আমি সিগারেটটা ফেলে দিতে বাধ্য হলুম। কোলকাতা ছাড়ার বেশ কয়েকমাস কেটে গেছে কিন্তু এখনও আমি এখানকার ক্যাপ্টেন পাইলটে ঠিক অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারিনি ,প্রত্যেকবারই টান দেবার সময় মনে হয় যেন শুকনো লঙ্কা পোড়া ধোঁয়া টানছি।দরজায় খট খট করে শব্দ হলো., আমি কম্বলের তলা থেকে উঠে গিয়ে দরজাটা সামান্য একটু খুলে দেখি বাইরে বিল্টুদা একদম রেডি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে
" চা খেতে যাচ্ছি , বেরোবি তো ?"
"ইয়ে না মানে .....আর কে কে সঙ্গে যাচ্ছে ?"
"আমি,শিলাজিৎ আর তরকারী চল চল তুইও চল "
"হুম দাঁড়াও জামাকাপড় পরে রেডি হচ্ছি "
"আচ্ছা জলদি কর "
আমি দরজা লাগিয়ে ,একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম, ক্ষিদেও একটা পাচ্ছিলো বটে ,আমি আর দেরি না করে সোয়েটারের ওপর একটা জ্যাকেট চাপিয়ে নিজেই নিজের মাথায় টুপি পরে রুম লক করে বেরোলাম।বিল্টুদার রুমটা হোস্টেলের একদম অন্য উইং এ , সেখানে গিয়ে দেখি শিলাজিৎদা আর বিল্টুদা দুজনে বারান্দায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেই বিষাক্ত পাইলট সিগারেট টানছে। আমি ওদের দিকে যেতে যেতে দেখলাম তরকারীদা রেডি হয়ে বেরিয়ে দরজায় তালা মারছে।
এই তালে বলে রাখি ভদ্রলোকের পিতৃদত্ত নাম অবশ্যই তরকারী নয় , আসলে হয়েছিল কি আমাদের হোস্টেলে পালংশাক মুলো আর তেঁতুল দিয়ে একটা বিচিত্র তরকারী হতো ভদ্রলোকের শুধু সেটা প্রিয়ই ছিলো না অন্য অনেক বিষয়ের এই তরকারিটি নিয়ে তিনি বড়ই যাকে obssed ছিলেন তাই এই নামকরণ
তা যাক সে কথা।
তরকারীদা আমাকে দেখে ভ্রু নাচিয়ে বললো
"কি খোকন তুমিও যাবে আজকে "
আমি বললাম
"এক যাত্রায় পৃথক ফল কি ভালো দেখায় বোলো "
"হ্যাহ হ্যাহ হ্যাহ "
"আস্তে মিশ্রা শুনতে পাবে " বিল্টুদা এসে ধমক দিলো ,তারপর বললো
"সবাই রেডী তো , চলো তাহলে অ্যাকশন কুইক কুইক "
আমরা ঝপাঝপ তিনতলার বারান্দা থেকে লাফ দিয়ে দোতলার কার্নিশে ল্যান্ড করে , তারপর কয়েক পা হেঁটে গিয়ে দোতলার বারান্দায় সিঁড়ির কাছে নেমে সিঁড়ি দিয়ে নিচে মেস ম্যানেজার মিশ্রার ঘরের কাছে এসে গেটের সামনের রাস্তার আলোটা নিবিয়ে দিয়ে অন্ধকারে বিশ ফুট দূরের প্রায় সাড়ে আটফুট বড়ো লোহার গেটটা টপকে বাইরের রাস্তায় নেমে দেখলাম বিল্টুদা আর শিলাজিৎদা রোজকার মতোই AS Useal First, বিল্টুদা ঘড়ি দেখছে আমি জিজ্ঞাসা করলাম
"আজকে কতক্ষন লাগলো?"
"আমাদের সাড়ে চার মিনিট , তোর এখনো পাঁচ গুড প্রগ্রেস "
শিলাজিৎদা বললো
"চলো গুরু এবার এট্টু চা খাওনের লগে ,বড়ো ক্ষুদা পাইসে ঐতো তরকারী আসতেসে। "
আমরা হাঁটা লাগলাম।
কিন্তু লঙ্কামোড়ে এসেই আক্কেল গুড়ুম হয়ে গেল
একদম মোড়ের মাথায় যে দোকানটা 24x7 খোলা থাকে তার ঝাঁপ বন্ধ, বোধহয় আজকে আবার পুলিশ ঝামেলা করেছে ,
তরকারীদা বলল "এবার কি করবে খোক্কন? ",বিল্টুদা বললো "এখন তো আর একটাই দোকান খোলা আছে সুন্দরলাল হাসপাতালের দিকে কিন্তু ওটার চা টা তো এক্কেবারে জঘন্য, শিলু ভাই তুমি কি বোলো ? "
শিলাজিৎদা শান্ত ভাবে বললো
" একটা কাজ করবা ? চলো আমরা একটা অটো ধরে ক্যান্ট চলে যাই ওখানে পহেলবানের দোকানের চা এর সাথে
বান-মাক্ষনও খাওয়া যাবে"
আমি পিলে চমকে গেল , শালা বলে কি !!!!
এই ডিসেম্বরের রাত একটার সময় বলে কিনা বেনারস ক্যান্টনমেন্ট স্টেশন যাবে যেটা এখন থেকে কম করে সাত কিমি দূরে , রুম থেকে বেরোনোর সময় ফোনে দেখেছিলাম অলরেডী তাপমাত্রা নয় ডিগ্রি
এর মধ্যে খোলা অটোতে করে অত দূর যেতে যেতে তো জমে কুলপি মেরে যাবো !!
অন্য দুজন একটু আমতা আমতা করে শেষমেষ রাজি হয়ে গেল , কারণ এতরাতে আর কোথাও চা পাওয়া সম্ভব নয় , আর আমি নিতান্তই টাটকা জুনিয়ার কাজেই আমার মতামতের কোনো প্রশ্নই উঠছে না। অটো খুঁজতে অবশ্য বেশি চাপ হলো না বেশ সহজেই পাওয়া গেল , কারণ লঙ্কামোড়ে অটো আর বিক্রমের বড়ো দুটো স্ট্যান্ড আছে যেখানে সবসময়ই স্টেশন যাবার অটো পাওয়া যায়। অটোতে উঠে ছাউনি ফেলে তো বসলুম কিন্তু সেই মাঝরাতের ফাঁকা রাস্তায় অটো উড়তে শুরু করার পর কনকনে ঠান্ডা হাওয়ার চোটে আমার তো প্রায় দাঁত কপাটি লাগার জোগাড়।
চলিশ মিনিটের রাস্তা পনেরো মিনিটে উড়িয়ে দিয়ে অটো যখন আমাদের স্টেশন চত্বরে নামিয়ে দিলো
ততক্ষনে আমার নাক, গাল,আঙ্গুল ঠান্ডায় অসাড় হয়ে গেছে , দুহাত ঘষতে ঘষতে আমি বললাম
"এবার কোন দিকে"
"আয় সোজা ফলো মি" বলে বিল্টুদা রওনা দিলো , আমার এর আগে কোনোদিনই এই পাহেলবানের দোকানে আসার দরকার পড়েনি ,কাজেই বাধ্য পোলার মতো আমি ওদের পিছু পিছু হাঁটতে শুরু করলাম, ওভারব্রিজ পেরিয়ে প্ল্যাটফর্ম ডিঙিয়ে একেবারে কারশেডের দিকে গিয়ে দেখি একটি ছোট্ট দোকান , এতো রাতেও লোকজন আছে , সামনের উনুনের ওপর একটা কড়াইতে টগবগ করে ভৈষা দুধ ফুটছে
শিলাজিৎদা এগিয়ে গিয়ে খাঁটি ভোজপুরিতে চারটে চা আর বান-মাক্ষনের অর্ডার দিলো।চা টা অবশ্য সঙ্গে সঙ্গে পাওয়া গেল বানটা পেতে নাকি একটু দেরিই হবে। আমি ফুটন্ত চা এর গ্লাসটা হাত দিয়ে ধরে গালে ঠেকাচ্ছিলাম , বেশ আরাম লাগছিলো
"এই নে " দেখি বিল্টুদা একটা সিগারেট এগিয়ে দিয়েছে , আমি কথা না বাড়িয়ে হাত বাড়িয়ে দিলাম
আগুন গরম চা টা গলা দিয়ে নামার পর যেন ঠান্ডাটা একটু বশে এলো । সিগারেট টানতে টানতে দেখলাম আমরা রেল ইয়ার্ডের একদম পিছনের দিকটায় চলে এসেছি , চায়ের দোকানে যারা বসে আছে তাদের দিকে এবার চোখ গেল,
"ওয়াগন ব্রেকার হলে আশ্চর্য হবোনা " আমার কানে ফিসফিস করে শিলাজিৎদা বললো
কথাটা খুব একটা ভুল নয় , সাধারণত খাঁটি উত্তরপ্রদেশীয়রা বেশ লম্বা চওড়া মোচদার আদমি হয় কিন্তু এই কয়জন এতটাই ষন্ডামার্কা যে দেখলেই কেমন যেন একটা অস্বস্তি লাগে , বিশেষ করে একজনের কোমরের কাছটা একটু সন্দেহজনক ভাবেই ফোলা।
শিরশিরানি ঠান্ডা আবার যেন পেটের তলায় ফিরে এলো , আমি দোকান থেকে একটু দূরে সরে এলাম তরকারী আর বিল্টুদা বাইরেই দাঁড়িয়েছিল তাদের দিকে এগিয়ে গেলাম ,মনে মনে ভাবছিলাম আরেকটা চা নেবো নাকি সোজা হোস্টেলের ছেলে হোস্টেলে ফিরে যাবো? এমন সময় গুড়ুম করে একটা জোরে শব্দ হলো দূরে রেল ট্রাকের ওপর দাঁড়ানো মালগাড়ি গুলোর দিকে ,আমি চমকে উঠেপিছন ফিরে শিলাজিৎদাকে ডাকতে গিয়ে দেখলাম যে দু তিন জন দোকানে বসে চা খাচ্ছিলো তাদের দুজন ছিটকে বেরিয়ে এসে ঐশব্দের দিকে দৌড় দিলো, তাদের একজনের পায়ের ঝটকায় দুধের বড়ো কড়াইটা একদম উল্টে গেল,আর একজনের গায়ের ধাক্কায় আমি ছিটকে পড়লাম রাস্তায় পড়তে পড়তে দেখলাম
তৃতীয়জনকে দোকানের মালিক আষ্টেপিষ্টে জাপ্টে ধরেছে কিন্তু পেরে উঠছে না , বিল্টুদা আর তরকারী
দৌড়ে এসে আমাকে ধরে তুলছিলো আর ঠিক তখনিই "ফটাস " করে একটা জোরে টায়ার ফাটার মতো শব্দ হলো , তৃতীয়জন দৌড়ে বেরিয়ে গেল আর দোকানদার ওই মাটিতে পড়ে থাকা দুধের ওপর কাটা কলাগাছের মতো ধড়াম করে পড়ে গেল, সেইসঙ্গেই দেখতে পেলাম তার শরীর থেকে লাল রক্ত বেরিয়ে
সাদা দুধের সাথে মিশে যাচ্ছে ,ব্যাস আমারও চোখে যেন অন্ধকার নেমে এলো , তারপর আর কিছুই মনে নেই।
(আপাতত চলবে )
বি দ্র -অধমের লেখা যদি ভালো লাগে দয়া করিয়া একটু শেয়ার করিবেন , এই গরীবের আর কোনো দাবি নেই.
৩
সরস্বতী বয়েস হোস্টেল
লঙ্কা মোড় ,২০১৩
রাত পৌনে একটা
সিগারেটটা ধরানোর ঠিক পরেই গলা দিয়ে মাকড়শার মতো গলগল করে কাশি বেরিয়ে এলো ,খ্যাকশেয়ালের মতো খ্যাক খ্যাক করে কাশতে কাশতে আমি সিগারেটটা ফেলে দিতে বাধ্য হলুম। কোলকাতা ছাড়ার বেশ কয়েকমাস কেটে গেছে কিন্তু এখনও আমি এখানকার ক্যাপ্টেন পাইলটে ঠিক অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারিনি ,প্রত্যেকবারই টান দেবার সময় মনে হয় যেন শুকনো লঙ্কা পোড়া ধোঁয়া টানছি।দরজায় খট খট করে শব্দ হলো., আমি কম্বলের তলা থেকে উঠে গিয়ে দরজাটা সামান্য একটু খুলে দেখি বাইরে বিল্টুদা একদম রেডি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে
" চা খেতে যাচ্ছি , বেরোবি তো ?"
"ইয়ে না মানে .....আর কে কে সঙ্গে যাচ্ছে ?"
"আমি,শিলাজিৎ আর তরকারী চল চল তুইও চল "
"হুম দাঁড়াও জামাকাপড় পরে রেডি হচ্ছি "
"আচ্ছা জলদি কর "
আমি দরজা লাগিয়ে ,একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম, ক্ষিদেও একটা পাচ্ছিলো বটে ,আমি আর দেরি না করে সোয়েটারের ওপর একটা জ্যাকেট চাপিয়ে নিজেই নিজের মাথায় টুপি পরে রুম লক করে বেরোলাম।বিল্টুদার রুমটা হোস্টেলের একদম অন্য উইং এ , সেখানে গিয়ে দেখি শিলাজিৎদা আর বিল্টুদা দুজনে বারান্দায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেই বিষাক্ত পাইলট সিগারেট টানছে। আমি ওদের দিকে যেতে যেতে দেখলাম তরকারীদা রেডি হয়ে বেরিয়ে দরজায় তালা মারছে।
এই তালে বলে রাখি ভদ্রলোকের পিতৃদত্ত নাম অবশ্যই তরকারী নয় , আসলে হয়েছিল কি আমাদের হোস্টেলে পালংশাক মুলো আর তেঁতুল দিয়ে একটা বিচিত্র তরকারী হতো ভদ্রলোকের শুধু সেটা প্রিয়ই ছিলো না অন্য অনেক বিষয়ের এই তরকারিটি নিয়ে তিনি বড়ই যাকে obssed ছিলেন তাই এই নামকরণ
তা যাক সে কথা।
তরকারীদা আমাকে দেখে ভ্রু নাচিয়ে বললো
"কি খোকন তুমিও যাবে আজকে "
আমি বললাম
"এক যাত্রায় পৃথক ফল কি ভালো দেখায় বোলো "
"হ্যাহ হ্যাহ হ্যাহ "
"আস্তে মিশ্রা শুনতে পাবে " বিল্টুদা এসে ধমক দিলো ,তারপর বললো
"সবাই রেডী তো , চলো তাহলে অ্যাকশন কুইক কুইক "
আমরা ঝপাঝপ তিনতলার বারান্দা থেকে লাফ দিয়ে দোতলার কার্নিশে ল্যান্ড করে , তারপর কয়েক পা হেঁটে গিয়ে দোতলার বারান্দায় সিঁড়ির কাছে নেমে সিঁড়ি দিয়ে নিচে মেস ম্যানেজার মিশ্রার ঘরের কাছে এসে গেটের সামনের রাস্তার আলোটা নিবিয়ে দিয়ে অন্ধকারে বিশ ফুট দূরের প্রায় সাড়ে আটফুট বড়ো লোহার গেটটা টপকে বাইরের রাস্তায় নেমে দেখলাম বিল্টুদা আর শিলাজিৎদা রোজকার মতোই AS Useal First, বিল্টুদা ঘড়ি দেখছে আমি জিজ্ঞাসা করলাম
"আজকে কতক্ষন লাগলো?"
"আমাদের সাড়ে চার মিনিট , তোর এখনো পাঁচ গুড প্রগ্রেস "
শিলাজিৎদা বললো
"চলো গুরু এবার এট্টু চা খাওনের লগে ,বড়ো ক্ষুদা পাইসে ঐতো তরকারী আসতেসে। "
আমরা হাঁটা লাগলাম।
কিন্তু লঙ্কামোড়ে এসেই আক্কেল গুড়ুম হয়ে গেল
একদম মোড়ের মাথায় যে দোকানটা 24x7 খোলা থাকে তার ঝাঁপ বন্ধ, বোধহয় আজকে আবার পুলিশ ঝামেলা করেছে ,
তরকারীদা বলল "এবার কি করবে খোক্কন? ",বিল্টুদা বললো "এখন তো আর একটাই দোকান খোলা আছে সুন্দরলাল হাসপাতালের দিকে কিন্তু ওটার চা টা তো এক্কেবারে জঘন্য, শিলু ভাই তুমি কি বোলো ? "
শিলাজিৎদা শান্ত ভাবে বললো
" একটা কাজ করবা ? চলো আমরা একটা অটো ধরে ক্যান্ট চলে যাই ওখানে পহেলবানের দোকানের চা এর সাথে
বান-মাক্ষনও খাওয়া যাবে"
আমি পিলে চমকে গেল , শালা বলে কি !!!!
এই ডিসেম্বরের রাত একটার সময় বলে কিনা বেনারস ক্যান্টনমেন্ট স্টেশন যাবে যেটা এখন থেকে কম করে সাত কিমি দূরে , রুম থেকে বেরোনোর সময় ফোনে দেখেছিলাম অলরেডী তাপমাত্রা নয় ডিগ্রি
এর মধ্যে খোলা অটোতে করে অত দূর যেতে যেতে তো জমে কুলপি মেরে যাবো !!
অন্য দুজন একটু আমতা আমতা করে শেষমেষ রাজি হয়ে গেল , কারণ এতরাতে আর কোথাও চা পাওয়া সম্ভব নয় , আর আমি নিতান্তই টাটকা জুনিয়ার কাজেই আমার মতামতের কোনো প্রশ্নই উঠছে না। অটো খুঁজতে অবশ্য বেশি চাপ হলো না বেশ সহজেই পাওয়া গেল , কারণ লঙ্কামোড়ে অটো আর বিক্রমের বড়ো দুটো স্ট্যান্ড আছে যেখানে সবসময়ই স্টেশন যাবার অটো পাওয়া যায়। অটোতে উঠে ছাউনি ফেলে তো বসলুম কিন্তু সেই মাঝরাতের ফাঁকা রাস্তায় অটো উড়তে শুরু করার পর কনকনে ঠান্ডা হাওয়ার চোটে আমার তো প্রায় দাঁত কপাটি লাগার জোগাড়।
চলিশ মিনিটের রাস্তা পনেরো মিনিটে উড়িয়ে দিয়ে অটো যখন আমাদের স্টেশন চত্বরে নামিয়ে দিলো
ততক্ষনে আমার নাক, গাল,আঙ্গুল ঠান্ডায় অসাড় হয়ে গেছে , দুহাত ঘষতে ঘষতে আমি বললাম
"এবার কোন দিকে"
"আয় সোজা ফলো মি" বলে বিল্টুদা রওনা দিলো , আমার এর আগে কোনোদিনই এই পাহেলবানের দোকানে আসার দরকার পড়েনি ,কাজেই বাধ্য পোলার মতো আমি ওদের পিছু পিছু হাঁটতে শুরু করলাম, ওভারব্রিজ পেরিয়ে প্ল্যাটফর্ম ডিঙিয়ে একেবারে কারশেডের দিকে গিয়ে দেখি একটি ছোট্ট দোকান , এতো রাতেও লোকজন আছে , সামনের উনুনের ওপর একটা কড়াইতে টগবগ করে ভৈষা দুধ ফুটছে
শিলাজিৎদা এগিয়ে গিয়ে খাঁটি ভোজপুরিতে চারটে চা আর বান-মাক্ষনের অর্ডার দিলো।চা টা অবশ্য সঙ্গে সঙ্গে পাওয়া গেল বানটা পেতে নাকি একটু দেরিই হবে। আমি ফুটন্ত চা এর গ্লাসটা হাত দিয়ে ধরে গালে ঠেকাচ্ছিলাম , বেশ আরাম লাগছিলো
"এই নে " দেখি বিল্টুদা একটা সিগারেট এগিয়ে দিয়েছে , আমি কথা না বাড়িয়ে হাত বাড়িয়ে দিলাম
আগুন গরম চা টা গলা দিয়ে নামার পর যেন ঠান্ডাটা একটু বশে এলো । সিগারেট টানতে টানতে দেখলাম আমরা রেল ইয়ার্ডের একদম পিছনের দিকটায় চলে এসেছি , চায়ের দোকানে যারা বসে আছে তাদের দিকে এবার চোখ গেল,
"ওয়াগন ব্রেকার হলে আশ্চর্য হবোনা " আমার কানে ফিসফিস করে শিলাজিৎদা বললো
কথাটা খুব একটা ভুল নয় , সাধারণত খাঁটি উত্তরপ্রদেশীয়রা বেশ লম্বা চওড়া মোচদার আদমি হয় কিন্তু এই কয়জন এতটাই ষন্ডামার্কা যে দেখলেই কেমন যেন একটা অস্বস্তি লাগে , বিশেষ করে একজনের কোমরের কাছটা একটু সন্দেহজনক ভাবেই ফোলা।
শিরশিরানি ঠান্ডা আবার যেন পেটের তলায় ফিরে এলো , আমি দোকান থেকে একটু দূরে সরে এলাম তরকারী আর বিল্টুদা বাইরেই দাঁড়িয়েছিল তাদের দিকে এগিয়ে গেলাম ,মনে মনে ভাবছিলাম আরেকটা চা নেবো নাকি সোজা হোস্টেলের ছেলে হোস্টেলে ফিরে যাবো? এমন সময় গুড়ুম করে একটা জোরে শব্দ হলো দূরে রেল ট্রাকের ওপর দাঁড়ানো মালগাড়ি গুলোর দিকে ,আমি চমকে উঠেপিছন ফিরে শিলাজিৎদাকে ডাকতে গিয়ে দেখলাম যে দু তিন জন দোকানে বসে চা খাচ্ছিলো তাদের দুজন ছিটকে বেরিয়ে এসে ঐশব্দের দিকে দৌড় দিলো, তাদের একজনের পায়ের ঝটকায় দুধের বড়ো কড়াইটা একদম উল্টে গেল,আর একজনের গায়ের ধাক্কায় আমি ছিটকে পড়লাম রাস্তায় পড়তে পড়তে দেখলাম
তৃতীয়জনকে দোকানের মালিক আষ্টেপিষ্টে জাপ্টে ধরেছে কিন্তু পেরে উঠছে না , বিল্টুদা আর তরকারী
দৌড়ে এসে আমাকে ধরে তুলছিলো আর ঠিক তখনিই "ফটাস " করে একটা জোরে টায়ার ফাটার মতো শব্দ হলো , তৃতীয়জন দৌড়ে বেরিয়ে গেল আর দোকানদার ওই মাটিতে পড়ে থাকা দুধের ওপর কাটা কলাগাছের মতো ধড়াম করে পড়ে গেল, সেইসঙ্গেই দেখতে পেলাম তার শরীর থেকে লাল রক্ত বেরিয়ে
সাদা দুধের সাথে মিশে যাচ্ছে ,ব্যাস আমারও চোখে যেন অন্ধকার নেমে এলো , তারপর আর কিছুই মনে নেই।
(আপাতত চলবে )
বি দ্র -অধমের লেখা যদি ভালো লাগে দয়া করিয়া একটু শেয়ার করিবেন , এই গরীবের আর কোনো দাবি নেই.
No comments:
Post a Comment