Search This Blog

Tuesday, 28 November 2017

প্যারাডক্স
                                                                              ৬

বৈকুন্ঠ আপার্টমেন্ট
নাগুয়া,  ২০১৫

                                                                            নাকেমুখে কনকনে ঠান্ডা হওয়াটা লাগতেই মেজাজটা চটকে গেল, উফঃ আজকে আবার!!!!পাশ ফিরে চোখ খুলে দেখলাম দরজাটা হাট করে খোলা , আর সেইখান দিয়েই হু হু করে  ঠান্ডা গাঙ্গেয় হাওয়া ঢুকছে।পাশের বিছানাটার দিকে তাকালাম , হ্যাঁ যা ভেবেছিলাম তাই। বিছানাটা  ফাঁকা।
"ভোসডিকে" ,
 আমার মহান ফ্ল্যাটমেট আয়ান-কুমার যথারীতি 8:45এ  ঘুম থেকে উঠেই  9:00  ক্লাস এটেন্ড করতে দৌড় লাগিয়েছে। দরজাবন্ধ করা বা দাঁত মাজার মতো তুচ্ছ জাগতিক বিষয়ে আর  মাথা ঘামায়নি।
অগত্যা কম্বলের মায়া ত্যাগ করে বেরোতেই  হলো, সময়টা ফেব্রুয়ারির মাঝবরাবর হলে কি হবে এখনো এ তল্লাটে শীতকাল বেশ ভালোমতোই আছে ,আর থাকবেও সেই মার্চ অব্দি।ঘড়িতে দেখলাম 9:20 বাজে, বাইরে এখনো সেভাবে রোদ ওঠেনি , আমি দরজাটা আর বন্ধ করলাম না।ব্রাশে পেস্ট লাগিয়ে দাঁতে ঘষতে ঘষতে কম্বলটা গায়ে জড়িয়ে বাইরেই ব্যালকনিতে এলাম। 
এই জায়গাটার নাম নগুয়া , লঙ্কামোড় থেকে একটু দূরেই শহরের একটু ভিতরের দিকে , এখান থেকে নদী হাঁটা পথে মিনিট সাতেক, ছাদে উঠলে দিব্যি দেখা যায়। আমি দাঁত মাজতে মাজতে চারিদিকে নজর বোলাচ্ছিলাম , আমারদের    এই ফ্ল্যাটটা চারতলার ওপরে আর এই  বিল্ডিংটা   একটা গলির তেমাথা -মোড়ের  ঠিক  মাঝখানে, কাজেই এই ব্যালকনিতে আসলেই  বেশ খানিকটা করে জনজীবন দেখা হয়ে  যায়।  আমি দেখছিলাম, সামনের তিনতলা বাড়ির বিশাল ছাদে গোটা কতক ছাগল চরছে , তার পাশেই একজন  উনুনে করে রান্না করছে  করছে একটু দূরে একজন খাটিয়াতে বসে চা খাচ্ছে, সামনের মাঠে বিশাল বিশাল মোষ চরছে , আর গলির মাথায় ছোট্ট একটা বাজার বসে ফলে  গোটা গলিটাই  জ্যামে  জমে আছে আর  সবাই সবাইকে চিৎকার করে কিছু বলে চলেছে  ,  একদম নিত্য নৈমিত্তিক ছকে বাঁধা ছবি।আমার নজরদারী দাঁত-মাজা প্রায় শেষ হয়ে এসেছিলো এমন সময় নিচের গলিতে একটা হইচই কানে এলো , ব্যাপারটা  কি!! সবাই একটু উত্তেজিত হয়ে কিছু একটা বলেছে , ঘন্টার একটা হাল্কা  টুং টুং শব্দ কানে এলো, তারপর দেখলাম রাস্তার সবাই সরে গিয়ে  পাশ কাটিয়ে রাস্তা ফাঁকা করে দিতে লাগলো  ,আমি মুখ ধোয়ার কথা ভুলে গিয়ে মুখে ব্রাশ গুঁজে নিচের দিকে  তাকিয়ে রইলাম এ  ব্যাপারখানা তো দেখতে হচ্ছে। কয়েক সেকেন্ড পরেই সব রহস্য পরিষ্কার হয়ে গেল একটা হাতি মর্নিং ওয়াকে বেরিয়েছে।  একটা আস্ত  কুচকুচে কালো হাতি , খুব সম্ভবতঘাটের  দিকের কোনো মঠের পোষা , কানে শুঁড়ে রীতিমতো তিলক কাটা বাবাজীই বটে।  ওপরে অবশ্য  মাহুত  বসে আছে আর হাতিবাবাজীর গলায় একটা পেল্লায় ঘন্টা বাঁধা আছে টুংটাং শব্দটা ওখান  থেকেই আসছে, আসে পাশের ছাদ ব্যালকনি থেকে সবাই ঝুঁকে পড়লো হাতি দেখতে। হাতিবাবাজীর অবশ্য কোন হেলদোল নেই সে দিব্বি নিজের মতো করে আসছে আর  যারাই ভালোবেসে কপি , কুমড়ো , শাক ইত্যাদি দিচ্ছে শুঁড় দিয়ে নিয়ে সোজা মুখে পুড়ে দিচ্ছে , আর বাচ্চা-কাচ্চা আর ফরেনাররা হাতি দেখে লাফাচ্ছে। আমি হেঁসে ফেললাম , ১৪ই ফেব্রুয়ারী দিনটা  একটা হাতি দেখে শুরু করলাম
     ভাবা যায় !!!! যাকগে কিছু তো নতুন হলো।


                                                                  ঘরে ফিরে ফ্রেশ হয়ে দেখি, কফি খাবার রাস্তা বন্ধ  দুধ-পাউরুটি কোনোটাই নেই ,
শালা অকালকুস্মান্ড, মনে মনে আয়ামকে গাল  দিতে দিতে , দরজা লাগিয়ে আপদমস্তক কম্বল মুড়ি দিয়েই নিচে নামলাম। নিচে গেটের সামনেই পারোস ভাইয়ার দুকান আছে ওখানেই দুধ পাউরুটি দুটোই পেয়ে  যাবো।পারোস ভাইয়ার দুকানে গিয়ে দেখি দুটি সুন্দরী বিদেশিনী দাঁড়িয়ে আছে একজনের হাতি দেখার হ্যাংওভার মনে হয় তখনও কাটেনি , অন্যজন পারোস ভাইয়াকে পান পাতা দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করে যাচ্ছে
" Qu'est ce que c'est "
আমি একটু চমকালাম আরে এতো ফরাসিতে জিজ্ঞাসা করছে " এটা কি", বেচারা পারোস ভাইয়া মাথা নেড়ে বলে যাচ্ছে
"ই পানুয়া হ্যাল বা" 
আমি সোজা পারোস ভাইয়ার সামনে গিয়ে কম্বলের একটা হাত বাড়িয়ে  টাকা এগিয়ে দিতে দিতে হাল্কা ভাবেই  বললাম
 "Bonjour ,Ceci est une feuille d'arbre ," (সুপ্রভাত এটি একটি গাছের পাতা ) পারোস ভাইয়া আমাকে চেনে তাই নিঃশব্দে টাকাটি নিয়ে হাত দুধ আর পাউরুটি ধরিয়ে দিলো , আমি সেগুলো কম্বলের তলায় ঢুকিয়ে নিতে নিতে বললাম "Tu peux manger" (আপনি খেতে পারেন) প্রথমত আমার এই ভাল্লুকের মতো কম্বল মুড়ি দিয়ে হাজির হওয়া তারপর যদি সেই ভালুকের মুখ দিয়ে নিজের মাতৃভাষা( পিতৃও হতে পারে কে জানে!) শুনে মনে হয় মহিলা প্রথমে একটু বোমকে গেছিলেন , এবার ওনার মুখ থেকে কথা বেরোলো "Tu connais le français?" (আপনি ফরাসি জানেন ?) আমি পেছনে ফিরে মুচকি হেঁসে বললাম "un peu" (সামান্য ) তারপর সোজা নিজের ফ্ল্যাটের দিকে হাঁটা লাগলাম , পিছনে যে দুজোড়া ফরাসি চোখ আমাকে দেখছে তা দিব্বি টের পাচ্ছিলাম , আসলে এই শীতকালে বেনারসে পরিযায়ী পাখিদের মতো পিল পিল করে ফরেনাররা আসে ,প্রথমের দিকে অবাক হতাম এখন দেখে দেখে চোখ পচে গেছে। আজকে দিনের শুরুটা বেশ অন্য ভাবেই রকম হলো।আমার আজকে বেলা একটার সময় ক্লাস হাতে অফুরন্ত সময় আছে ল্যাদ খাওয়াই যায়, ঘরে ফিরে কফি বানিয়ে পাউরুটি নিয়ে আয়াম এর বিছানায় বসলাম।কফিতে চুমুক দিয়ে আধশোয়া হয়ে সিগ্রেটটা ধরাতে গিয়েই মনে পড়লো আজকে ১৪ই ফেব্রুয়ারী , কয়েক বছর আগেও আজকের দিনটা নিয়ে কি ভয়ানক উন্মাদনা থাকতো , গিফ্ট কেনা , বড়ো করে একটা চিঠি লেখা , দাম কম হবে বলে আগেরদিনই গোলাপ জোগাড় করে রাখা উফঃ!!!! বাপরে বাপ!!!!! কি সব দিনকাল ছিল.......... আমি সিগারেটে টান দিয়ে চোখ বুঝলাম ; কলকাতা ,সাধুপালের আখড়া ,অরুন ,পিয়া , রিহার্সাল , কলেজ-ফেস্ট,মারামারি ,পাগলামী ,প্রেম ,অবৈধ নেশা,লাইট -ক্যামেরা -একশন আর তিয়াশা , উফঃ মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই যে মানুষের জীবন যে এইভাবে একশো আশি ডিগ্রি পাল্টে যেতে পারে সেটা নিজের সাথে না হলে বোধহয় কোনদিনই বুঝে উঠতে পারতাম না। আমি সিগারেটটা ফেলে দিয়ে উঠে বসলাম , ধুর ভালো লাগছেনা , পুরানো জীবন মনে পড়লেই কেমন যেন একটা ভালোলাগামাখা কষ্ট হয়। সবে 10 টা বাজে , এককাজ করি স্নান করে এখনই বেরিয়ে পড়ি দুপুরের খাওয়াটা হোস্টেলের কারুর ঘাড় ভেঙে খাওয়া যাবে। স্নানের জন্য জলটা করতে ইমারসন রড প্লাগে গুঁজতে যাবো এমন সময় আমার ফোনটা ডেকে উঠলো বিরক্তিতে আমার ভুরুটা কুঁচকে গেল , এখন আবার কে ফোন মারাচ্ছে !!! ফোনটা হাতে নিয়ে দেখি স্ক্রিনের নম্বরটা পূর্বাশার , "হালো " কোনো কথা নেই , কেমন যেন একটা সোঁ সোঁ করে শব্দ হচ্ছে , আর একটা আবঝা শব্দও কানে এলো আমি আবার বললাম "হালো ," কোনো সাড়া নেই এবার একটা ফোঁসফোঁস শব্দ হতে লাগলো , এবার আমার ভয় করতে লাগলো আমি একটু কড়া গলায় বললাম "কি হয়েছে তোর " এবার স্পষ্ট ফোঁপানির শব্দ পেলাম , খুব জড়ানো গলায় উত্তর এলো "আমার এক্সিডেন্ট হয়েছে .........." আমি শুদু কোনো রকমে জিজ্ঞাসা করলাম "কোথায় আছিস এখন " "হেলথ সেন্টার .........." আমি বাকি কথা না শুনেই ফোনটা কেটে দিলাম , জ্যাকেটটা গায়ে চড়িয়ে দরজাটায় তালা মারতে মারতে আমার একটা কথাই মাথায় ঘুরছিলো , একসিডেন্টটা কতটা গুরুতর !!!!!! আজকে আর কি কি ঘটবে কে জানে। .........জয় বাবা বিশ্বনাথ (চলবে ) বি দ্র - ভালো লাগিলে ,Please,Please,Please share

No comments: